Kaler Alo
বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬
১৯ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৪:২২ পিএম

নতুন অস্ত্র, নতুন কৌশল: ফের যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৪:২২ পিএম

নতুন অস্ত্র, নতুন কৌশল: ফের যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আবারও বড় ধরনের সংঘাতে জড়ানোর আশঙ্কা বাড়ছে ইরানের। সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় নতুন অস্ত্র, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও পরিবর্তিত যুদ্ধকৌশল নিয়ে প্রস্তুত থাকার দাবি করেছে তেহরান। দেশটির সামরিক কর্মকর্তাদের হুঁশিয়ারি, এবার যুদ্ধ শুরু হলে প্রতিপক্ষকে আগের চেয়ে বেশি মূল্য দিতে হবে। সংঘাতের পরিধি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ আবারও শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নতুন করে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘খুব শিগগির, যেকোনোভাবে’ শেষ হবে। তেহরানকে একটি চুক্তিতে রাজি হতে হবে, নইলে ‘কঠোর শাস্তি’ নেমে আসবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

ক্ষতিগ্রস্ত বাহিনী, নতুন প্রস্তুতির দাবি
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার হোসেইন কানানি মোগাদ্দামের দাবি, চলতি বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়লেও এখন তাদের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে।

আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকাও বিস্তৃত করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা, নির্ভুলতা ও ওয়ারহেডের সক্ষমতা উন্নত হয়েছে। ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সক্ষমতা বেড়েছে।

কানানি মোগাদ্দাম আরও বলেন, প্রতিপক্ষের নতুন সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জাম শনাক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি আরও বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

‘১০০ শতাংশ প্রস্তুত’ থাকার দাবি
ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, দেশটি আবার আক্রান্ত হলে আগে প্রকাশ করা হয়নি—এমন সামরিক সক্ষমতা ও লক্ষ্যবস্তুর তথ্য সামনে আনা হবে এবং সেগুলো ব্যবহারও করা হবে।

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ, আইআরজিসি ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা সম্প্রতি সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। সম্ভাব্য হামলার জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নতুন হামলা হলে জবাব হবে তাৎক্ষণিক। সংঘাত পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, আরেকটি হামলা মোকাবিলায় বাহিনী ‘১০০ শতাংশ প্রস্তুত’। অদূর ভবিষ্যতে ‘সর্বোচ্চ প্রতিরোধক্ষমতা’ অর্জনই তাঁদের লক্ষ্য।

অসম যুদ্ধকৌশলে জোর
ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আকরামিনিয়ার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামের শ্রেষ্ঠত্বের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে ইরানি কমান্ডাররা ‘অসম যুদ্ধকৌশল’ অনুসরণ করবেন।

তাঁর ভাষ্য, জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, সেই সময় কিছু অস্ত্র সংস্কার করা হয়েছে, নতুন সরঞ্জাম যুক্ত হয়েছে এবং নতুন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

গত মাসে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ভূগর্ভস্থ একটি ড্রোন উৎপাদনকেন্দ্রের চিত্র দেখানো হয়। এ ছাড়া আরাশ অ্যাটাক ড্রোনের উন্নত সংস্করণ প্রদর্শন করে কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, ড্রোনটির ওয়ারহেডের ওজন দ্বিগুণ করে ১০০ কেজি করা হয়েছে এবং নিশানা নির্ধারণের ব্যবস্থাও উন্নত করা হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অস্ত্র সংগ্রহের অভিযোগ
গত সপ্তাহে প্রকাশিত রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সামরিক সংস্থা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত চীন, রাশিয়া ও জার্মানি থেকে রকেটের জ্বালানি, বিস্ফোরক, ডেটোনেটর, টাইটানিয়াম ও ভারী ট্রাকসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম আনা হয়েছে। এসব উপকরণ ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক ব্যবস্থায় ব্যবহার করা সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

যুদ্ধের সময় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, রাডার ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের অনেকগুলো ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কানানি মোগাদ্দামের দাবি, সচল থাকা ও নতুন করে তৈরি করা ব্যবস্থাগুলোর নির্ভুলতা বাড়ছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

হরমুজ প্রণালি নিয়েও হুঁশিয়ারি
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলকে ইরানি কর্তৃপক্ষ ‘অননুমোদিত’ বলে বিবেচনা করে। এ জলপথে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন কানানি মোগাদ্দাম।

তিনি দাবি করেন, সমুদ্রে তেলবাহী বিশাল জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা ইরান দেখিয়েছে। তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

অন্যদিকে দক্ষিণ ইরানের বন্দরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধ আবার শুরু হলে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
সামরিক প্রস্তুতির দাবি থাকলেও ইরানের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র ও আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন সংঘাত শুরু হলে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা, তেল-গ্যাস স্থাপনা, পেট্রোকেমিক্যাল ও ইস্পাত কারখানা, সড়ক এবং রেলপথ হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এতে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নেতৃত্বের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন
দুই দফা সংঘাতেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হয়েছেন। মার্চের শুরুতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। নিরাপত্তার কারণেই এমনটি করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে ইরানের ভেতরে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার বিষয়ে জবাবদিহির দাবি উঠেছে।

রাষ্ট্রীয় মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক হামজেহ রহিম সাফাভি এক টেলিভিশন আলোচনায় বলেন, ইরান গুরুতর আঘাত পেয়েছে, যার অন্যতম কারণ গোয়েন্দা তথ্যের দুর্বলতা। তাঁর মতে, এ বিষয়ে যথেষ্ট আলোচনা ও জবাবদিহি হচ্ছে না।

তবে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের সদস্য ইসমাইল কৌসারি দাবি করেছেন, শীর্ষ নেতাদের হত্যা করলেও প্রতিপক্ষ তাদের মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তাঁর ভাষ্য, ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং দেশটিকে খণ্ডবিখণ্ড করাই ছিল শত্রুদের লক্ষ্য।

যুদ্ধের আশঙ্কা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা সম্ভাব্য হামলার জবাব নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও নতুন যুদ্ধের বাস্তবতা এখনো অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তির চাপ ও কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি, আর তেহরানের পাল্টা প্রস্তুতির দাবি—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।

যদি সংঘাত আবার শুরু হয়, তা শুধু দুই দেশের সামরিক শক্তির পরীক্ষা হবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে হরমুজ প্রণালি, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনে। ফলে সম্ভাব্য যুদ্ধের ভয়াবহতা কতটা হবে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর।

কালের আলো/এমএসআইপি/জেএন

Link copied!