দুপুরের খাবারের পর কিংবা একটানা কয়েক ঘণ্টা কাজের শেষে অনেকেরই চোখে ঘুম নেমে আসে। কমতে থাকে মনোযোগ, ধীর হয়ে পড়ে কাজের গতি। ক্লান্তি কাটাতে কেউ চা-কফির ওপর ভরসা করেন, কেউ আবার একটু হাঁটাহাঁটি করে সতেজ হওয়ার চেষ্টা করেন। তবে এসবের পাশাপাশি কার্যকর হতে পারে ছোট্ট একটি ঘুম। দিনের ব্যস্ততার মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ২০ মিনিটের এই ঘুমকে বলা হয় ‘পাওয়ার ন্যাপ’। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময়ে ও নির্দিষ্ট সময় ধরে ঘুমাতে পারলে তা সাময়িক ক্লান্তি কমিয়ে সতর্কতা ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
অল্প ঘুমেই বাড়তে পারে সতর্কতা
পাওয়ার ন্যাপ বলতে দিনের বেলায় অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে নেওয়াকে বোঝায়। এর উদ্দেশ্য দীর্ঘ সময় বিশ্রাম নেওয়া নয়; বরং শরীর ও মস্তিষ্ককে সাময়িক বিরতি দিয়ে নতুন করে কাজে মনোযোগী করে তোলা।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথের (এনআইওএসএইচ) তথ্য অনুযায়ী, দিনের বেলায় ১৫ থেকে ২০ মিনিটের ছোট ঘুম সতর্কতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে পরদিন এমন সংক্ষিপ্ত ঘুম উপকারী হতে পারে।
২০০৬ সালে ‘স্লিপ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ২৪ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের ওপর বিভিন্ন সময়ের ঘুমের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, মাত্র ১০ মিনিটের ঘুমের পর অংশগ্রহণকারীদের ক্লান্তি কমে এবং মনোযোগ ও কর্মদক্ষতার উন্নতি ঘটে। গবেষণায় ঘুমের কিছু ইতিবাচক প্রভাব প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার প্রমাণও পাওয়া যায়। তবে গবেষণাটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত হয়েছিল। তাই সবার ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
কখন ও কতক্ষণ ঘুমাবেন?
পাওয়ার ন্যাপের সুফল পেতে ঘুমের সময় ও দৈর্ঘ্য গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ো ক্লিনিকের পরামর্শ অনুযায়ী, ২০ থেকে ৩০ মিনিটের ঘুম অনেকের জন্য কার্যকর হতে পারে। তবে কাজের ফাঁকে দ্রুত সতেজ হতে চাইলে ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে ঘুম সীমিত রাখা ভালো। প্রয়োজনে অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে পারেন, যাতে নির্ধারিত সময়ের বেশি ঘুম না হয়।
দুপুরের খাবারের পর থেকে বিকেলের শুরুর সময়টিকে পাওয়ার ন্যাপের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচনা করা হয়। তবে বিকেল ৩টার পর ঘুমালে রাতে স্বাভাবিক সময়ে ঘুম আসতে সমস্যা হতে পারে। তাই দিনের ঘুমের সময় নির্ধারণে রাতের ঘুমের বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরি।
ঘুমানোর জন্য শান্ত, আরামদায়ক ও কম আলো-শব্দযুক্ত জায়গা বেছে নেওয়া ভালো। ঘুম থেকে ওঠার পরপরই গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত না হয়ে কয়েক মিনিট সময় নিলে শরীর ও মন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারে।
বেশি সময় ঘুমালে হতে পারে উল্টো ফল
পাওয়ার ন্যাপের উদ্দেশ্য অল্প সময়ে সতেজ হওয়া। কিন্তু ঘুম দীর্ঘ হয়ে গেলে অনেক সময় উল্টো ঝিমুনি ও অবসাদ দেখা দিতে পারে। ঘুমের গভীর পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার পর হঠাৎ জেগে উঠলে সাময়িক বিভ্রান্তি, ক্লান্তি এবং মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এ অবস্থাকে বলা হয় ‘স্লিপ ইনারশিয়া’।
বিশেষ করে আগে থেকেই ঘুমের ঘাটতি থাকলে ঘুম থেকে ওঠার পর এই অস্বস্তি বেশি অনুভূত হতে পারে। তাই দিনের বেলায় দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাওয়ার ন্যাপ শেষ করাই ভালো।
রাতের ঘুমের বিকল্প নয় পাওয়ার ন্যাপ
পাওয়ার ন্যাপ সাময়িকভাবে কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করলেও এটি রাতের পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নয়। সুস্থ থাকার জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিত রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করা জরুরি। দিনের ছোট ঘুম দিয়ে দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
এ ছাড়া পর্যাপ্ত রাতের ঘুমের পরও যদি নিয়মিত অতিরিক্ত ঘুম পায় বা ক্লান্তি অনুভূত হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, কাজের ফাঁকে ১০ থেকে ২০ মিনিটের একটি ছোট ঘুম দিনের ক্লান্তি কমিয়ে মনোযোগ ও সতর্কতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর সুফল পেতে ঘুমের সময়, পরিবেশ ও দৈর্ঘ্যের দিকে খেয়াল রাখার পাশাপাশি রাতের পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাও জরুরি। তথ্যসূত্র: সিডিসি
কালের আলো/এএএন/জেএন
