গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনকে ঘিরে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরির নেপথ্যে উঠে এসেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ছয় সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও সাত প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে তাঁদের সংশ্লিষ্ট ১৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সেপাল গ্রুপ, সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদীর এনভয় গ্রুপ, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের রেনেসাঁ গ্রুপ, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর হামিদ গ্রুপ এবং সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের ফেবিয়ান গ্রুপ।
- গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ছয় সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও সাত ব্যবসায়ীর কারখানার নাম
- পলাতক মালিকদের ফোনে নির্দেশনা, কারাবন্দিদের প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তাদের মাধ্যমে উসকানির
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কেউ পলাতক, কেউ রয়েছেন কারাগারে। অভিযোগ রয়েছে, পলাতক মালিকদের কেউ কেউ দেশের বাইরে থেকে ফোনে নির্দেশনা দিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছেন। আর কারাগারে থাকা মালিকদের প্রতিষ্ঠানে তাঁদের অনুপস্থিতিতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে চলছে আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়ার তৎপরতা। ছয় সাবেক মন্ত্রী-এমপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগপন্থি আরও সাত ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানও রয়েছে এই তালিকায়।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের মধ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার এমন তথ্য সামনে আসার পর শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতার নেপথ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধনের বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছেন। তাঁর বক্তব্য, কিছু শিল্প মালিকও এই তৎপরতায় জড়িত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ সরকারের হাতে রয়েছে।
সোমবার (০২ নভেম্বর) সচিবালয়ে পোশাকশিল্প মালিকদের দুটি সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের আলোচনা চলার মধ্যেই পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। এ ঘটনায় জড়িত শিল্প মালিক, শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যেসব কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা মালিকপক্ষের কাছে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অস্থিরতা তৈরিতে ভূমিকা রাখা শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের নামও দিতে বলা হয়েছে।
ছয় সাবেক মন্ত্রী-এমপির কারখানা গোয়েন্দা নজরে
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসা ছয় সাবেক মন্ত্রী-এমপির সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশের পরিচিত কয়েকটি শিল্পগ্রুপ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের নাম এসেছে তালিকায়। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সেপাল গ্রুপ এবং সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদীর এনভয় গ্রুপও রয়েছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।
এ ছাড়া সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের রেনেসাঁ গ্রুপের ইন্টারস্টফ অ্যাপারেল, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর হামিদ গ্রুপের হামিদ সোয়েটার্স লিমিটেড এবং সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের ফেবিয়ান গ্রুপের ফেবিয়ান গার্মেন্টস লিমিটেডের নাম এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের রাজনৈতিক পরিচয়, বর্তমান অবস্থান এবং কারখানার অভ্যন্তরীণ তৎপরতা নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকাভুক্ত মালিকদের কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, আবার কেউ কারাগারে রয়েছেন। পলাতক মালিকদের পক্ষ থেকে ফোনে নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, কারাবন্দি মালিকদের অনুপস্থিতিতে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা শ্রমিকদের মধ্যে উসকানি ছড়ানোর কাজে ভূমিকা রাখছেন বলে জানা গেছে।
তালিকায় আওয়ামী লীগপন্থি আরও সাত ব্যবসায়ী
ছয় সাবেক মন্ত্রী-এমপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত আরও সাত প্রভাবশালী গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তুষুকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান বাদল, ওয়েল গ্রুপের আব্দুস সালাম এবং নিপা গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. খসরু চৌধুরী।
এ ছাড়া তালিকায় রয়েছেন মানিকগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও অ্যাক্সিস নিটওয়্যার্স লিমিটেডের মালিক জাহিদ আহমেদ টুলু, স্মার্ট গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম মোশাররফ হুসাইন এবং গিভেন্সি গ্রুপের মাসুমা খাতুন লিপা। তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নামও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব কাজে লাগিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করেছেন।
আন্দোলনের মাঠে ছাত্রলীগের তৎপরতা
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে দলটির পদধারী নেতাকর্মীদের দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। শ্রমিক আন্দোলনকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সক্রিয় হয়েছেন বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে আটকের খবরও পাওয়া গেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজিবুল ইসলাম নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আন্দোলনসংক্রান্ত একাধিক ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন। গত রোববার দুপুর ২টা ১৭ মিনিটে একটি ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কারও ওপর ভর করে ক্ষমতায় আসবে না। আমরা জনগণের শক্তি সঙ্গে নিয়ে কর্মসূচি দেব।’
এর ৫১ মিনিট আগে একটি ভিডিও পোস্ট করেন তিনি। একই দিন দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে আরেকটি ভিডিও এবং সকাল ১০টা ৬ মিনিটে শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে একটি পোস্ট দেন সাজিবুল। সেখানে তিনি লেখেন, ‘শ্রমিকের বেতন ৩০ হাজার টাকার বৃদ্ধির দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো আজকেও শ্রমিক আন্দোলন চলছে।’ এর আগে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে আগুন জ্বালানোর একটি ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। ওই ভিডিওতে ‘৩০ হাজার বেতন দে, নইলে গদি ছেড়ে দে’ স্লোগান শোনা যায়।
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আড়ালে তৃতীয় পক্ষ
উচ্চ পণ্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতির চাপে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমান মজুরিতে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। ফলে মজুরি বৃদ্ধির দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। অতীতেও মজুরি বৃদ্ধির প্রতিটি পর্যায়ে শ্রমিকদের আন্দোলন করতে হয়েছে।
এবারও শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আগেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে। একপর্যায়ে এতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও কারখানা বন্ধের ঘটনা যুক্ত হয়।
বিজিএমইএ নেতা ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের বক্তব্য অনুযায়ী, শুরুতে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন হলেও পরে এর মধ্যে তৃতীয় পক্ষ প্রবেশ করে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জোর করে রাস্তায় নামানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
শ্রমিক নেতা ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন একটি পক্ষ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। সোমবার দিনভর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকে তাঁরা বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকরা জড়িত নন। তিনি বলেন, শ্রমিকদের উসকানিতে পা না দিয়ে আন্দোলন থেকে সরে এসে দ্রুত শান্তিপূর্ণভাবে কাজে ফেরার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
ইন্ধনের প্রমাণ পেলে সেবা বন্ধ করবে বিজিএমইএ
শ্রমিক আন্দোলনে কোনো কারখানা মালিকের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সব ধরনের সেবা দেওয়া বন্ধ করার কথা জানিয়েছে বিজিএমইএ। সংগঠনটির পরিচালক ও নতুন গঠিত মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবিএম সামছুদ্দিন বলেন, কোনো কারখানার মালিক শ্রমিক আন্দোলনে ইন্ধন দিচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে তাঁদের কাছে নিশ্চিত তথ্য নেই। বিষয়টি সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভালো বলতে পারবে। তবে কোনো গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে এ ধরনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিজিএমইএ থেকে তাঁর কারখানাকে সব ধরনের সেবা দেওয়া বন্ধ করা হবে।
নতুন মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি জানান, হাইকোর্টের মাধ্যমে বোর্ডের চেয়ারম্যানের নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর দ্রুত বৈঠকে বসা হবে। কয়েক দফা আলোচনায় সব পক্ষের মতামত নিয়ে চলতি নভেম্বর মাসের মধ্যেই শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করার প্রত্যাশা রয়েছে।
তবে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কিছু গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাঁদের নাম আসার কথা জানানো হলেও সংগঠনটি এখনো কোনো তালিকা হাতে পায়নি। এ বিষয়ে এর বেশি কিছু বলতে পারেননি তিনি। তবে শিল্পাঞ্চলে চলমান ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, সোমবার ৬৭৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে।
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বন্ধ রাখা কারখানার তালিকা চেয়েছে সরকার
শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যেসব কারখানা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠান ও মালিকের তালিকা চেয়েছে সরকার। সোমবার পোশাকশিল্প মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ নির্দেশনার কথা জানান। একই সঙ্গে অস্থিরতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের নামও দিতে বলা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার বিশ্বাস করে কোনো শ্রমিক বা শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে না। তবে কেউ ভুলবশত এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ইন্ধন দিয়ে থাকলে তাঁকে সেখান থেকে সরে আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি কিংবা রাজনৈতিক কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সীমান্তের ওপার থেকে কেউ ইশারায় পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করা হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য স্বার্থ রক্ষা এবং শিল্পের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সরকারের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কারখানা বন্ধ থাকুক, তা সরকার চায় না। শ্রমিক আন্দোলনের নামে যারা সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অস্থিরতা তৈরির পরিকল্পনা সফল হবে না: মাহদী আমিন
শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজি করে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের অস্থিতিশীলতা তৈরির যেকোনো পরিকল্পনা সফল হতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
গত সোমবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, গার্মেন্টস শিল্পের সঙ্গে লাখ লাখ শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সরবরাহব্যবস্থা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি জড়িত। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য ও প্রাপ্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয়, অন্যান্য খাতের বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি জানান, এসব বিষয় সামনে রেখে মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
জানুয়ারি থেকে বাড়তি মজুরি দেওয়ার আশ্বাস
শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতার। গত সোমবার শ্রম ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে মজুরি বোর্ডে কাজ করা হবে, যাতে আগামী জানুয়ারি থেকেই তাঁরা বাড়তি মজুরি হাতে পান। এ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকপক্ষের স্থায়ী প্রতিনিধি আনোয়ার হোসাইন উপস্থিত ছিলেন।
বাবুল আখতার আরও বলেন, চলমান মজুরি আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কিছু শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যারা শুধু ন্যায্য মজুরির দাবি উত্থাপন কিংবা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে আটক হয়েছেন, তাঁদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা ও ব্যবস্থা প্রত্যাহারের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
৬৭৯ কারখানা বন্ধ, কাজে ফিরতে পারেননি ১৬ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক
শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাবে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর-ময়মনসিংহ এবং সাভার-আশুলিয়া-জিরানী শিল্পাঞ্চলের ৬৭৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কাজ বন্ধ করে শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৭২ জন শ্রমিককে কাজ না করেই বাড়ি ফিরতে হয়েছে। সোমবার বিজিএমইএ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সংস্থাটির বেলা সাড়ে ১১টার হিসাব অনুযায়ী, দেশের পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে মোট ২ হাজার ১৩৪টি পোশাক কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৪৬৪টি চালু ছিল। গাজীপুর ও ময়মনসিংহ শিল্পাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে। এ দুই এলাকায় থাকা ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ৩৮২টির শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বেরিয়ে যান। ফলে কাজ না করেই বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭২ জন শ্রমিক।
সাভার-আশুলিয়া ও জিরানী শিল্পাঞ্চলের ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ২২৩টির কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এসব এলাকায় কাজ না করে বাড়ি ফিরে যান ৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫০ জন শ্রমিক। রাজধানীর মিরপুরে ৩২০টি পোশাক কারখানার মধ্যে ৬৫টির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে কাজ না পেয়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন ৫৩ হাজার ৪৫০ জন শ্রমিক। তবে নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের কোনো প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ। নারায়ণগঞ্জের ১৯৭টি এবং চট্টগ্রামের ৩১৪টি পোশাক কারখানাই স্বাভাবিকভাবে চালু ছিল।
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে
