যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাস। তিন দশকের বেশি সময় ধরে অঙ্গরাজ্যটিতে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ডেমোক্র্যাটরা। তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই চিত্র বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ৩৭ বছর বয়সী ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী জেমস টালারিকোকে ঘিরে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
তাঁর হাত ধরে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো টেক্সাসের সিনেট আসন নিজেদের দখলে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছে ডেমোক্র্যাটরা। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোট। টেক্সাসের সিনেট আসনে টালারিকোর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটন।
নির্বাচনকে ঘিরে দুই দলের মধ্যে চলছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। টেক্সাসের এই আসনের লড়াই যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনের ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে ব্যয়ের পরিমাণ ৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কার আশঙ্কা
টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য জয় শুধু একটি সিনেট আসন দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের প্রভাবশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জয় দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা হবে।
টেক্সাসের রিপাবলিকান নির্বাচনী কৌশলবিদ ব্রেন্ডান স্টেইনহাউজার বলেন, ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে টেক্সাসসহ পুরো যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান পার্টিকে নিজেদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। এতে দলটি মানসিকভাবেও বড় ধাক্কা খাবে।
কে এই ৩৭ বছর বয়সী জেমস টালারিকো
রাজনীতিতে টালারিকোর উত্থান অনেকটাই বিস্ময়কর। ২০২৫ সালেও তিনি অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের তুলনামূলকভাবে অপরিচিত একজন ডেমোক্র্যাট নেতা ছিলেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই নির্বাচনী প্রচার ও বক্তব্যের মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। খ্রিষ্টান ধর্মযাজক হওয়ার জন্য পড়াশোনা করেছিলেন টালারিকো। তাঁর প্রচারের ধরনও অন্য অনেক রাজনীতিকের তুলনায় আলাদা। মৃদুস্বরে কথা বলা এই প্রার্থী রক্ষণশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করেন।
তাঁর অভিযোগ, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতি ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের যথেষ্ট সংবেদনশীলতা নেই। রাজনীতিতে বিপুল অর্থের প্রভাবেরও সমালোচনা করেন তিনি। টালারিকো সিনেটে দুর্নীতিবিরোধী একটি সর্বাত্মক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, রাজনীতিতে বিভেদ ও চরমপন্থার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রচারে মানুষের ব্যাপক সাড়া
নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে টেক্সাসের লাবক শহরে যান টালারিকো। সেখানে তাঁকে দেখতে মানুষের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। ফিয়েস্তা সেন্টারে আয়োজিত সমাবেশে অংশ নিতে আসা মানুষের ভিড় ভবন ছাড়িয়ে পার্কিং লট পেরিয়ে ব্যস্ত সড়ক পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
পশ্চিমাঞ্চলের ধুলোমাখা সমতল ভূমিতে অবস্থিত প্রায় আড়াই লাখ মানুষের এই শহরে একজন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর এমন সমাবেশ ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ, দুই বছর আগে শহরটির ভোটারদের বড় একটি অংশ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন।
সমাবেশে প্রায় তিন হাজার সমর্থকের সামনে বক্তব্য দেন টালারিকো। বাইরে আরও প্রায় এক হাজার মানুষ স্পিকারে তাঁর বক্তব্য শোনেন। তাঁর প্রচারে অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, রাজনৈতিক বিভাজন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। হকলি কাউন্টির ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান অ্যারন গনজালেজ বলেন, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। টালারিকোর সমাবেশে মানুষের উপস্থিতি দেখে তিনি আশাবাদী।
পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছেন টালারিকো
নির্বাচনী প্রচারে টালারিকো বলছেন, টেক্সাসের মানুষ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। তাঁর মতে, চরমপন্থা ও বিভেদ সৃষ্টির রাজনীতির পরিবর্তে মানুষ এখন নতুন ধরনের নেতৃত্ব চায়। তিনি বলেন, ‘টেক্সাসের মানুষ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। চরমপন্থা ও দুর্নীতির দিন শেষ। বিভেদ সৃষ্টির রাজনীতিও আর নয়। মানুষ এখন নতুন কিছু চায়।’
প্রচারের শেষ দুই সপ্তাহের জন্য তাঁর নির্বাচনী স্লোগান, ‘স্বচ্ছ দৃষ্টি, পূর্ণ হৃদয়, হারার কোনো সুযোগ নেই’। এই স্লোগানের মাধ্যমে ভোটারদের মধ্যে আশাবাদ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জাগানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
জয় নিয়ে আশাবাদ, তবে সংশয়ও রয়েছে
টালারিকোর প্রচারে মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি ডেমোক্র্যাটদের আশাবাদী করলেও সংশয় কাটছে না অনেকের। লাবকের সমাবেশে উপস্থিত টেক্সাস টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অ্যান্ড্রু রবিনসনও তেমনই একজন। ২৬ বছর বয়সী এই তরুণের কাছে টালারিকোর বক্তব্য ভালো লেগেছে। তবে টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের অতীত ব্যর্থতার কথা মনে করে তিনি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছেন না।
রবিনসন বলেন, টালারিকো জিতলে তা তাঁর কাছে অনেক বড় ঘটনা হবে। টেক্সাসে থেকে যাওয়ার ইচ্ছা তাঁর খুব একটা ছিল না। তবে সরকার পরিবর্তন হলে সেটি সেখানে থেকে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে। ২০১৬, ২০২০ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে টেক্সাসে জয় পেয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে এবারের সিনেট নির্বাচনেও রিপাবলিকানদের সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটব্যাংক বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
৫০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয়ের নির্বাচন
টেক্সাসের সিনেট আসনের নির্বাচন ঘিরে দুই দল ও তাদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। নির্বাচনী প্রচারের মোট ব্যয় ৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে স্পষ্ট, আসনটি দুই দলের কাছেই কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। টালারিকোর সম্ভাব্য জয় ডেমোক্র্যাটদের জন্য দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হতাশা কাটানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের জন্য এটি হবে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি ধরে রাখার বড় পরীক্ষা।
সব মিলিয়ে মঙ্গলবারের (৩ নভেম্বর) ভোটের দিকে তাকিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহল। ৩৭ বছর বয়সী টালারিকো কি পারবেন তিন দশকের বেশি সময়ের রিপাবলিকান আধিপত্যে চিড় ধরাতে, নাকি টেক্সাসে নিজেদের দুর্গ ধরে রাখবে রিপাবলিকানরা—সেই উত্তর মিলবে নির্বাচনের ফলাফলে।সূত্র: বিবিসি
কালের আলো/এসএ/টি সি
