অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণদের দেশ ছাড়ার প্রবণতা কমাতে নতুন এক উদ্যোগ নিয়েছে ভুটান। দেশটিতে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘মাইন্ডফুলনেস’ নগর। এরই অংশ হিসেবে এক দিনে ১০৮টি বৌদ্ধ স্তূপ নির্মাণে অংশ নিয়েছেন হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন দেশটির বিপুলসংখ্যক মানুষ।
রোববার ( ১ নভেম্বর ) ভারতের সীমান্তসংলগ্ন গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটির নির্ধারিত এলাকায় নদীর প্রায় ১২ কিলোমিটার তীরজুড়ে এসব স্তূপ নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি স্তূপের উচ্চতা ১৫ মিটার। আয়োজকদের মতে, পাথর ও মাটির মাধ্যমে স্থায়ী রূপ দেওয়া এসব স্থাপনা প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক।
এক দিনে স্তূপ নির্মাণে ৪০ হাজার স্বেচ্ছাসেবী
ভুটানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যরাতের পর থেকেই স্তূপ নির্মাণের কাজ শুরু করেন ৪০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবী। বৌদ্ধধর্মে ১০৮ সংখ্যাটিকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হয়। ভুটানেও বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রচলন থাকায় এই সংখ্যাকে কেন্দ্র করে আয়োজনটি বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রায় দুই লাখ মানুষ অংশ নেন, যা ভুটানের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। দেশটির রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক বলেন, এক দিনে ১০৮টি স্তূপ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
রাজার উদ্যোগে নতুন নগর প্রকল্প
ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুকের উদ্যোগে ২০২৪ সালে বিশেষ রাজকীয় সনদের মাধ্যমে গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। শহরটির নকশা তৈরির দায়িত্বে রয়েছেন ডেনমার্কের স্থপতিরা। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো টেকসই ব্যবসা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, শিক্ষা, পর্যটন এবং আর্থিক সেবা খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।
এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে গেলেফু প্রায় ১০ হাজার মানুষের একটি ছোট শহর। ভুটানের রাজধানী থিম্পু থেকে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে ভারতের সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে শহরটির অবস্থান।
তরুণদের বিদেশমুখী প্রবণতা কমানোর পরিকল্পনা
বেকারত্ব, জন্মহার কমে যাওয়া এবং দক্ষ কর্মীদের বিদেশে চলে যাওয়ার মতো বিভিন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে ভুটান। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশ উন্নত কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার সুযোগের সন্ধানে দেশ ছাড়ছেন।
এ পরিস্থিতিতে নতুন নগর প্রকল্পকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছে দেশটির সরকার। সরকারের আশা, গেলেফুতে নতুন শিল্প, ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান বাড়বে। একই সঙ্গে বিদেশে না গিয়ে নিজ দেশেই ভবিষ্যৎ গড়তে উৎসাহিত হবেন তাঁরা।
বিনিয়োগ নিয়ে সংশয়, যুক্ত হচ্ছেন আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তারা
তবে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। কারণ, নতুন শহর গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। তবে প্রকল্পটিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। ভারতের ধনকুবের গৌতম আদানি গত জানুয়ারিতে প্রকল্পটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছেন।
এ ছাড়া শহরটিকে ভারতের আসাম রাজ্যের রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৯ সালের মধ্যে সেখানে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ভুটান। সব মিলিয়ে গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি শুধু একটি নতুন নগর নির্মাণ প্রকল্প নয়, বরং অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়ে ভুটানের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের একটি বড় পরিকল্পনা। সূত্র: আলজাজিরা, এএফপি ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)
কালের আলো/এসএ/আরআইকে
