তৈরি পোশাকশিল্পের নতুন মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে সাতজন নেতার নাম প্রস্তাব করেছেন শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা। কয়েক দফা আলোচনা শেষে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ও শনিবার (৩১ অক্টোবর) এসব নাম চূড়ান্ত করা হয়। প্রস্তাবিত সাতজনের মধ্য থেকে একজনকে নতুন মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
প্রস্তাবিত সাতজন হলেন—জাতীয় শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি মোশরেফা মিশু, বাংলাদেশ অ্যাপারেল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি তৌহিদুর রহমান, বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার, গ্রিন বাংলা শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি সুলতানা বেগম, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) নেতা শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা আমিনুল হক আমিন এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) কর্মকর্তা কোহিনুর আক্তার।
দুই দিনের বৈঠকে চূড়ান্ত হয় সাত নাম
শ্রমিকনেতাদের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রীর বাসভবনে শ্রমিক সংগঠনগুলোর একাংশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে প্রথমে পাঁচজন শ্রমিকনেতার নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে কাজী রুহুল আমিনের নাম প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে চারজনের নাম চূড়ান্ত থাকে। তারা হলেন মোশরেফা মিশু, তৌহিদুর রহমান, বাবুল আক্তার ও সুলতানা বেগম।
এরপর শনিবার (৩১ অক্টোবর) দিনভর রাজধানীর ধানমন্ডিতে শ্রমিকবিষয়ক একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কার্যালয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেন শ্রমিকনেতারা। এসব আলোচনায় আরও তিনজনের নাম যুক্ত হয়। প্রথম দফায় শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর ও আমিনুল হক আমিনের নাম প্রস্তাব করা হয়। সর্বশেষ বৈঠকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের কর্মকর্তা কোহিনুর আক্তারের নাম যুক্ত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে সাতজনের নাম চূড়ান্ত হয়।
শিগগিরই মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা
এর আগে গত ২৭ অক্টোবর সিরডাপের একটি অনুষ্ঠানে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছিলেন, মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধির নাম প্রস্তাব করেছে। শ্রমিকনেতারাও তাদের প্রতিনিধির নাম প্রস্তাব করবেন। শিগগিরই নতুন মজুরি বোর্ড ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
শুক্রবার রাতে নিজ বাসভবনে শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক শেষে মন্ত্রী বলেন, ‘শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। আগামী রোববার সকাল থেকেই মজুরি বোর্ড গঠনের কার্যক্রম শুরু হবে। ইনশাআল্লাহ, আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই শ্রমিক ভাই-বোনেরা তাদের কাঙ্ক্ষিত দাবি পূরণের সুসংবাদ পাবেন।’ শিল্প ও শ্রমিকের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও দাবিদাওয়া নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের শিল্পকারখানাগুলোও টিকিয়ে রাখতে হবে।
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে এক মাসের বেশি সময় ধরে আন্দোলন
তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকেরা এক মাসের বেশি সময় ধরে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। তাদের দাবি, সর্বশেষ সংশোধিত শ্রম আইন অনুযায়ী নভেম্বরের মধ্যে পুরোনো মজুরি বোর্ডের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তাই নির্ধারিত সময়ের আগেই নতুন মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করে নতুন ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে হবে।
শুরুতে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষ নতুন মজুরি বোর্ড গঠনে অনীহা দেখালেও পরে সম্মতি জানায়। সরকারও পরিস্থিতি বিবেচনায় নভেম্বরের মধ্যেই বোর্ড পুনর্গঠনের ঘোষণা দেয়। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন ও নাম প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে সময় লাগায় বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিক্ষোভের মধ্যেই প্রতিনিধি তালিকা চূড়ান্ত
বোর্ড গঠনে বিলম্বের কারণে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সর্বশেষ ৩১ অক্টোবর গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই শ্রমিকনেতারা বৈঠক করে সাতজনের নাম প্রস্তাব করলেন। প্রস্তাবিত সাতজনের মধ্য থেকে একজনকে শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে মজুরি বোর্ডে নেওয়া হবে। এ ছাড়া বোর্ডে থাকবেন একজন মালিক প্রতিনিধি, একজন সরকারি প্রতিনিধি এবং একজন নিরপেক্ষ প্রতিনিধি।
সরকারের ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, রোববার (১ নভেম্বর) বোর্ড গঠনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পর ছয় মাসের মধ্যে পোশাকশ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হবে। ঘোষিত মজুরি পরবর্তী তিন বছর কার্যকর থাকবে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এখন শ্রমিকদের প্রত্যাশা, দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন করে তাদের দীর্ঘদিনের বেতন বৃদ্ধির দাবি বিবেচনায় নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিল্পকারখানার সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি
