Kaler Alo
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬
২০ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমানের চীন সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা, ট্রাম্পের রাজনৈতিক পতনের শুরু?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা, ট্রাম্পের রাজনৈতিক পতনের শুরু?

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি। একসময় দলটির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের কাছে পরাজিত হয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থীরা। এই ফলাফল ট্রাম্পের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্বের ওপর বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কি ট্রাম্পের রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান শুরু হলো?

নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প ভোটারদের বারবার তাঁর কথা মনে রেখে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এমনকি ব্যালটে নিজের নাম না থাকলেও তাঁকে সামনে রেখেই ভোট দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু ভোটের ফল বলছে, তাঁর সেই আহ্বানে প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। বরং রিপাবলিকানদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও নীতির প্রতি ভোটারদের অসন্তোষ স্পষ্ট হয়েছে।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধস
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের জাতীয় ভোটে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ১৩ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। নির্বাচনী ফলাফলের এই ব্যবধান ১৯৭৬ সালের পর কোনো কংগ্রেস নির্বাচনে একটি দলের জন্য সবচেয়ে বড় জয় বলে উল্লেখ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস।

১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটন এবং ২০১০ সালে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাকালে রিপাবলিকানরা যে বড় জয় পেয়েছিল, এবারের ডেমোক্র্যাটদের ব্যবধান সেসব রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। যদিও আসন পুনর্বিন্যাসের কারণে জাতীয় ভোটের এই ব্যবধান সমানুপাতে কংগ্রেসের আসনে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল শুধু রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয় নয়; বরং ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রতি ভোটারদের আস্থায় বড় ধরনের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত। বিশেষ করে যেসব ভোটার একসময় পরিবর্তনের আশায় ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন, তাঁদের একটি অংশ এবার দলটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন অথবা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।

কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ভোটাররা?
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারের নীতিনির্ধারণ নিয়ে অসন্তোষ।

নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের কাছে ভোটারদের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং নতুন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়া। কিন্তু ইরানের সঙ্গে সংঘাতের প্রভাব জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও চাপের মুখে পড়ে।

এ ছাড়া আমদানি শুল্কের কারণে ভোক্তাদের খরচ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর গ্রেপ্তার অভিযান অনেক ভোটারের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।

ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগও নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এসব কারণে একসময় তাঁর প্রতি আস্থাশীল ভোটারদের একটি অংশ এবার সমর্থন প্রত্যাহার করেছে।

নিজের পছন্দের প্রার্থীদেরও রক্ষা করতে পারেননি ট্রাম্প
নির্বাচনে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পছন্দের কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীর পরাজয় তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট করেছে। টেক্সাসের কেন প্যাক্সটন এবং সাউথ ক্যারোলাইনার ডারলিন গ্রাহামের মতো প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। অথচ এসব অঙ্গরাজ্য দীর্ঘদিন ধরেই রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থীদের নির্বাচনী কৌশল ও প্রচারে ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রে উল্টো ফল দিয়েছে। দলের প্রার্থীদের তাঁর প্রতি শতভাগ আনুগত্য দেখানোর চাপও তাঁদের স্বাধীনভাবে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত করেছে।

এ ছাড়া রিপাবলিকানদের সুবিধা দিতে প্রতিনিধি পরিষদের আসন পুনর্বিন্যাসে ট্রাম্পের চাপও প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি। বরং নির্বাচনের ফলাফলে সেই কৌশল বুমেরাং হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের দাবি, তিনি ব্যালটে ছিলেন না
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর ট্রাম্প একে নিজের বিরুদ্ধে জনগণের রায় হিসেবে মানতে চাননি। তাঁর যুক্তি, তিনি নিজে নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন না। মঙ্গলবার রাতে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ব্যালটে তাঁর নাম না থাকায় পর্যাপ্ত ভোটারকে কেন্দ্রে আনা সম্ভব হয়নি।

তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারের বাস্তবতার অসংগতি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, পুরো প্রচারেই তিনি নিজেকে সামনে রেখেছিলেন এবং ভোটারদের তাঁর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক পরিচালক ডগলাস সসনিকের মতে, এই ফলাফল ট্রাম্প, রিপাবলিকান পার্টি এবং গত দুই বছরের শাসনব্যবস্থার প্রতি ভোটারদের কঠোর প্রত্যাখ্যান।

ক্ষমতায় থাকলেও বাড়বে রাজনৈতিক চাপ
মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজিত হলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের মেয়াদ এখনো দুই বছর বাকি। ফলে তাঁর হাতে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে কংগ্রেসে বিরোধীদের শক্তি বাড়লে আইন প্রণয়ন, বাজেট এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাঁকে বাড়তি বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।

ট্রাম্পের সহযোগীরা অবশ্য এখনই তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নারাজ। রক্ষণশীল অর্থনৈতিক নীতির পক্ষে কাজ করা সংস্থা ক্লাব ফর গ্রোথের সভাপতি ডেভিড ম্যাকইনটোশের মতে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিদায়ের ভবিষ্যদ্বাণী আগেও করা হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর মতে, রিপাবলিকানদের নিজেদের নীতিগত অবস্থানে ফিরে গিয়ে ২০২৮ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে।

অন্যদিকে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এবারের ফলাফল ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব কমে আসার ইঙ্গিত দিলেও তাঁর নেতৃত্বের অবসান নিশ্চিত করে না। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় নির্বাচনী বিপর্যয়ের পরও দলগুলো ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাস কি আবারও ফিরে আসবে?
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল অনেক সময় ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় রিপাবলিকানদের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু মাত্র ছয় বছর পর রোনাল্ড রিগ্যানের নেতৃত্বে দলটি আবার হোয়াইট হাউসে ফিরে আসে।

একইভাবে ১৯৯৪ ও ২০১০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় জয়কে যথাক্রমে বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামার প্রেসিডেন্সির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে তাঁরা দুজনই পুনর্নির্বাচিত হন।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের অধ্যাপক লিন ভাভরেকের মতে, এবারের নির্বাচনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর মতে, এতে মাগা আন্দোলন বা ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠী পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা যে আগের তুলনায় কমেছে, তা স্পষ্ট।

ডেমোক্র্যাটদের সামনেও নতুন চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনে বড় জয় পেলেও ডেমোক্র্যাটদের সামনে এখন নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন রয়েছে। এত দিন দলটির প্রধান রাজনৈতিক অবস্থান ছিল ট্রাম্পবিরোধিতা। কিন্তু শুধু বিরোধিতা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জনসমর্থন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

দলের প্রগতিশীল অংশ মনে করছে, বামপন্থী কর্মী ও সমর্থকদের সক্রিয়তাই এই জয়ের প্রধান কারণ। অন্যদিকে মধ্যপন্থীদের ধারণা, টেক্সাস ও কানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্পের নীতিতে অসন্তুষ্ট রিপাবলিকান ভোটারদের সমর্থন আদায় করাই ছিল সাফল্যের বড় কারণ।

ফলে আগামী দিনে ডেমোক্র্যাটদের সামনে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয়ে সুস্পষ্ট কর্মসূচি দেওয়ার চাপ থাকবে।

সব মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনে বড় ধাক্কা। তবে এই ফলাফলই তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায়ের শেষ—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো যাচ্ছে না। বরং আগামী দুই বছরে ট্রাম্প কীভাবে এই ধাক্কা সামাল দেন এবং ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের বিজয়কে কতটা স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পারেন, তার ওপরই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির পরবর্তী গতিপথ। সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

কালের আলো/এসএ/জেএন

Link copied!