Kaler Alo
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬
২০ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমানের চীন সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০৫:০০ পিএম

বিএমইউর নিয়োগ বাণিজ্য: অভিযোগ শতকোটি, অনুসন্ধান ঢিমেতালে

কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০৫:০০ পিএম

বিএমইউর নিয়োগ বাণিজ্য: অভিযোগ শতকোটি, অনুসন্ধান ঢিমেতালে

দুই হাজারের বেশি নিয়োগ, পদোন্নতি ও চাকরি স্থায়ীকরণের নামে শতকোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ। ২০০ নার্স নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে চাকরি পেয়েছেন ৬৭০ জন। স্থায়ীকরণের আদেশ বাতিল করে নতুন করে টাকা নিয়ে চাকরি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বাদ যাননি উপাচার্যের স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনেরাও। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তলব করা হয় তার, স্ত্রী ও তিন সন্তানের ব্যাংক হিসাব এবং সম্পদের তথ্য। কিন্তু এরপরই যেন থেমে যায় অনুসন্ধানের চাকা। ২০২৪ সালে শুরু হওয়া অনুসন্ধান দুই বছরের বেশি সময়েও শেষ হয়নি। শতকোটি টাকার দুর্নীতির এতসব অভিযোগের পরও দুদকের এই দীর্ঘসূত্রতা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

  • বিএমইউর সাবেক ভিসি শারফুদ্দিনের বিরুদ্ধে নিয়োগ-পদোন্নতি বাণিজ্য ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ 
  • ২০০ নার্সের বিজ্ঞপ্তিতে ৬৭০ নিয়োগ, স্বজনদের চাকরির অভিযোগও রয়েছে 
  • দুই বছরেও শেষ হয়নি অনুসন্ধান 

দুদকের সংশ্লিষ্ট নথি বলছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে শারফুদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। একই সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর শারফুদ্দিন আহমেদ, তার স্ত্রী অধ্যাপক নাফিজা আহমেদ এবং তিন সন্তান তাজবীর আহমেদ, তানবীর আহমেদ ও তাহমিদ আহমেদ সাদাতের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের তথ্য চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠান দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা।

এরপর থেকে অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। বর্তমানে দুদকের উপপরিচালক মো. রাশেদুল ইসলাম অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন। অনুসন্ধানের অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অন্যান্য অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এ অভিযোগের অনুসন্ধান শেষ করতে একটু দেরি হচ্ছে।' কবে নাগাদ অনুসন্ধান শেষ হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।

নিয়োগে জনপ্রতি ২০ লাখ টাকা
দুদকে জমা পড়া অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ নিয়োগ বাণিজ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার পর শারফুদ্দিন আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের ঘনিষ্ঠদের বসিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেন। এই বলয়ের মাধ্যমে তিন বছরে দুই হাজারের বেশি জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, পদমর্যাদা অনুযায়ী প্রতিটি নিয়োগের বিপরীতে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। চাকরি স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতির সময়ও জনপ্রতি দুই থেকে তিন লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। শুধু এসব খাত থেকেই শতকোটি টাকার বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

২০০ নার্সের জায়গায় ৬৭০ জন
নিয়োগে অনিয়মের চাঞ্চল্যকর আরেকটি অভিযোগ ২০২১ সালের সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগকে ঘিরে। ওই বছর ২০০ জন নার্স নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য তিনটি পৃথক কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। লিখিত পরীক্ষার পর মৌখিক পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু অভিযোগে বলা হয়েছে, নির্ধারিত ২০০ জনের পরিবর্তে শেষ পর্যন্ত ৬৭০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রত্যেকের কাছ থেকে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে বিষয়টি জানেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

৩৭৪ জনের স্থায়ীকরণ বাতিল, পরে সাড়ে ৫০০ জন
২০২১ সালের ২২ মার্চ তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া তৃতীয় শ্রেণির ৬৪ জন ও চতুর্থ শ্রেণির ৩১০ জনসহ মোট ৩৭৪ জন অস্থায়ী কর্মচারীর চাকরি স্থায়ীকরণের আদেশ দেন। এর মাত্র সাত দিন পর, ২৯ মার্চ উপাচার্যের দায়িত্ব পান শারফুদ্দিন আহমেদ। অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর আগের উপাচার্যের দেওয়া স্থায়ীকরণের আদেশ বাতিল করেন তিনি। পরে নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার নামে কর্মচারীদের কাছ থেকে দুই থেকে তিন লাখ টাকা করে নিয়ে চাকরি স্থায়ী করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় সাড়ে ৫০০ জনকে স্থায়ীকরণ করে কয়েক কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

উপাচার্যের ছেলে, ছেলের স্ত্রীসহ স্বজনদের চাকরি
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও কম নয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের ছেলে ডা. তানভীর আহমেদকে ২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর হেড নেক বিভাগে মেডিকেল অফিসার পদে নিয়োগ দেন শারফুদ্দিন আহমেদ। একই সময়ে তার ছেলের স্ত্রী ডা. ফারহানা খানম ফারহাসহ একাধিক আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিকে বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়া হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তার ভাগ্নে, ফুফাতো ভাইয়ের স্ত্রী, শ্যালিকার পুত্র এবং পিএসের স্বজনদেরও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ছেলে তানভীরকে বিধিবহির্ভূতভাবে একাধিক কোর্সে ভর্তি করার অভিযোগ রয়েছে। অন্য ছেলে তাজবীর আহমেদ শিক্ষা ছুটি নিয়ে পাঁচ বছর বিদেশে অবস্থান করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

পদোন্নতিতে তিন বছরের সুবিধা
শারফুদ্দিন আহমেদের নিজের পদোন্নতি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০১ সালে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির আবেদন করার সময় তার প্রয়োজনীয় এমএস ডিগ্রি ছিল না। নির্বাচন কমিটিও শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ করেছিল। পরে ২০০৪ সালের ৪ নভেম্বর সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে চারটি শর্তে তাকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পদোন্নতিটি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ২০০৪ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে। কিন্তু ২০০৭ সালের ৮ জানুয়ারি জারি করা এক আদেশে কার্যকর তারিখ পরিবর্তন করে ২০০১ সালের ১২ জুলাই করা হয়। এর ফলে প্রায় তিন বছর আগের তারিখ থেকে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

টেন্ডার ছাড়াই ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকার সমাবর্তন
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন, প্রকাশনা, ক্যান্টিন ও ক্যাফেটেরিয়া পরিচালনা নিয়েও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, টেন্ডার ছাড়াই সমাবর্তন আয়োজন করে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রকাশনা, ম্যাগাজিন ও ব্যাগ ছাপানো এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের নামেও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। ক্যান্টিন, ক্যাফেটেরিয়া ও আউটসোর্সিংয়ের কাজ বণ্টনে পছন্দের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োগ দিয়ে বেতন বাবদ প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে।

বিদেশ সফর ও ক্লাসের সম্মানী নিয়েও প্রশ্ন
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মালয়েশিয়ার ইউসিএসআই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে সফরে যান শারফুদ্দিন আহমেদ। অভিযোগে বলা হয়েছে, সফরের যাতায়াতসহ খরচ সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বহন করলেও দেশে ফেরার পর বিমানভাড়ার জন্য ৩ লাখ ৩৭ হাজার ২৭৭ টাকার বিল উপস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে অনারারি শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নেওয়ার বিপরীতে সম্মানী প্রদানের নিয়ম থাকলেও নিজে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ক্লাসের সম্মানী নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুনে চারটি এবং জুলাইয়ে দুটি ক্লাসের বিপরীতে মোট ১২ হাজার টাকা সম্মানী নেন তিনি।

অনুসন্ধানের গতি কোথায় হারাল?
এতসব অভিযোগের পরও দুদকের অনুসন্ধান কেন দুই বছরের বেশি সময় ধরে শেষ হচ্ছে না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের তথ্য চাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পরবর্তী অগ্রগতির বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিজেও সময়সীমা জানাতে পারছেন না। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শনিবার সন্ধ্যায় অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

কালের আলো/এমএএন/এমকে

Link copied!