সকালের নাশতায় চিড়া, দুপুরে-রাতে ভাত—বাঙালির প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার এই দুই পরিচিত খাবারেই মিলেছে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন বিষাক্ত রাসায়নিক আফলাটক্সিন। রাজধানীর খোলাবাজার ও সুপারশপ থেকে সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষা করে গবেষকরা দেখেছেন, প্রতি ১০০টি চিড়ার নমুনার ৫৫টিতে এবং চালের প্রায় ২৮টিতে রয়েছে এ বিষাক্ত উপাদান। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, নিয়মিত এসব খাবার গ্রহণের ফলে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে, যার প্রভাব শিশুদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি হতে পারে। যদিও নমুনায় পাওয়া আফলাটক্সিনের মাত্রা আন্তর্জাতিক সর্বোচ্চ অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করেনি, তবু গবেষণার ফল দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
- রাজধানীর বাজারের ৫৫ শতাংশ চিড়ায় মিলেছে আফলাটক্সিন
- চালে ২৭.৬৩ শতাংশ; শিশুদের ঝুঁকি বেশি, মুড়িতে নেই দূষণ
আফলাটক্সিন কোনো সাধারণ দূষণকারী উপাদান নয়। নির্দিষ্ট প্রজাতির ছত্রাক থেকে তৈরি এ বিষাক্ত রাসায়নিক দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশ করলে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস এবং লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় যথাযথভাবে শুকানো এবং সংরক্ষণ না করা খাদ্যশস্যে এ ছত্রাকের বিস্তার ঘটে। বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর দেশে বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
‘বাংলাদেশের খুচরা বাজারে বিক্রি হওয়া চাল ও চালজাত পণ্যে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি: খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে আফলাটক্সিনের সংস্পর্শ এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকির মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘টক্সিকোলজি রিপোর্টস’-এ। গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন বাজার ও সুপারশপ থেকে সংগ্রহ করা ১২১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৭৬টি চাল, ২০টি চিড়া এবং ২৫টি মুড়ির নমুনা ছিল।
পরীক্ষায় দেখা যায়, ৭৬টি চালের নমুনার মধ্যে ২১টিতে বা ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশে আফলাটক্সিন রয়েছে। এসব নমুনায় প্রতি কেজিতে শূন্য দশমিক ৪৭ থেকে ৩ দশমিক ৬৩ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত মোট আফলাটক্সিন পাওয়া গেছে। চিড়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ২০টি নমুনার ১১টিতে বা ৫৫ শতাংশে শনাক্ত হয়েছে এ বিষাক্ত উপাদান। প্রতি কেজি চিড়ায় এর মাত্রা ছিল শূন্য দশমিক ৩৭ থেকে শূন্য দশমিক ৮৭ মাইক্রোগ্রাম। বিপরীতে পরীক্ষিত ২৫টি মুড়ির নমুনার একটিতেও আফলাটক্সিন পাওয়া যায়নি।
সীমার নিচে মাত্রা, তবু দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
গবেষণায় পাওয়া মাত্রা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম না করলেও দীর্ঘদিন এসব খাবার গ্রহণের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ ঝুঁকি মূল্যায়নে গবেষকরা ব্যবহার করেছেন মার্জিন অব এক্সপোজার বা এমওই সূচক। সাধারণভাবে এ সূচকের মান ১০ হাজারের নিচে হলে জনস্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য উদ্বেগের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চালের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের এমওই ৮ দশমিক ৩৬ এবং শিশুদের ৪ দশমিক ৮৯। চিড়ার ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এ মান ৩ হাজার ৭৭১ দশমিক ৪০ এবং শিশুদের জন্য ১ হাজার ৫ দশমিক ৭১। অর্থাৎ চাল ও চিড়া উভয় ক্ষেত্রেই সূচকের মান ১০ হাজারের নিচে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম এমওই দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য গ্রহণের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
গবেষণায় চালের মাধ্যমে আফলাটক্সিন গ্রহণের কারণে সম্ভাব্য লিভার ক্যান্সারের ঘটনাও হিসাব করা হয়েছে। গবেষকদের অনুমান, প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বছরে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৫১টি এবং শিশুদের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৮৮টি লিভার ক্যান্সারের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি গবেষণাভিত্তিক ঝুঁকির হিসাব, বাস্তবে নিশ্চিতভাবে ঘটবে এমন রোগীর সংখ্যা নয়।
চিড়ায় দূষণ বেশি কেন?
চালের তুলনায় চিড়ায় আফলাটক্সিনের উপস্থিতির হার বেশি হওয়ার পেছনে উৎপাদন ও সংরক্ষণপ্রক্রিয়াকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। ধান ভিজিয়ে তাপ প্রয়োগের পর যন্ত্রের সাহায্যে চ্যাপ্টা করে চিড়া তৈরি করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় দানার উপরিভাগ ও তুষের অংশের সংস্পর্শ, পাশাপাশি আর্দ্রতা ছত্রাকের বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। অপর্যাপ্ত শুকানো ও অনুপযুক্ত সংরক্ষণ এ ঝুঁকি আরও বাড়ায়।
মৌসুমভেদেও দূষণের হারে পার্থক্য পাওয়া গেছে। ২০২২ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত গরম ও বর্ষা মৌসুমে চালের ২৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ নমুনায় আফলাটক্সিন মিলেছে। শীত ও শুষ্ক মৌসুমে এ হার ছিল ২৫ শতাংশ। চিড়ার ক্ষেত্রে প্রথম দফায় দূষণের হার ছিল ৬০ শতাংশ, দ্বিতীয় দফায় ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ আর্দ্র ও গরম আবহাওয়ায় দূষণের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে, মুড়ির কোনো নমুনায় আফলাটক্সিন না পাওয়ার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে গবেষকরা এর উৎপাদনে উচ্চ তাপমাত্রার ব্যবহার এবং শুষ্ক পরিবেশে সংরক্ষণের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতাই কি কারণ?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেন মনে করেন, চালের মধ্যে আফলাটক্সিন তৈরির কারণ চিহ্নিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। অনুন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা এর অন্যতম কারণ হতে পারে। তাঁর মতে, দূষণের মাত্রা হয়তো এখনই বড় ধরনের ক্ষতির পর্যায়ে পৌঁছেনি, কিন্তু বিষয়টিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দূষণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষাও জরুরি।
গবেষণায় আফলাটক্সিনের চারটি ধরন—এএফবি১, এএফবি২, এএফজি১ ও এএফজি২ পরীক্ষা করা হয়েছে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তরল ক্রোমাটোগ্রাফি ও ফ্লুরেসেন্স ডিটেকশন (এইচপিএলসি-এফএলডি) পদ্ধতিতে নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়। পরীক্ষা করা হয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাভারের ইনস্টিটিউট অব ফুড অ্যান্ড রেডিয়েশন বায়োলজিতে।
১১ গবেষকের এ দলে নয়জন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী এবং দুজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। গবেষণায় নেতৃত্ব দেন কমিশনের ইনস্টিটিউট অব ফুড অ্যান্ড রেডিয়েশন বায়োলজির মো. হেদায়েতুল ইসলাম ও ড. নজরুল ইসলাম।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমনও আফলাটক্সিনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তাঁর ভাষ্য, এ উপাদান লিভারের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে ১৫ থেকে ১৬ গুণ বেশি মাত্রায় আফলাটক্সিনযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গবেষকরা খাদ্যশস্যের উৎপাদন, সংগ্রহ, শুকানো, পরিবহন ও সংরক্ষণের প্রতিটি পর্যায়ে উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি বাজারে নিয়মিত নজরদারি, খাদ্যপণ্যে আফলাটক্সিন পরীক্ষা জোরদার এবং দ্রুত দূষণ শনাক্তের প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
গবেষণার নমুনা ঢাকার বাজার থেকে সংগ্রহ করা হলেও পণ্যগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছে। ফলে এই ফলাফলকে পুরো দেশের খাদ্যপণ্যের দূষণের হার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বৃহত্তর পরিসরে খাদ্যনিরাপত্তা পরীক্ষা ও নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাই সামনে এনেছে। প্রতিদিনের খাবারে বিষাক্ত উপাদানের এমন উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—খাদ্যশস্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার পাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে তো?
কালের আলো/টিইকে/এমকে
