Kaler Alo
বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬
১৯ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

রাঙামাটি সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ১২:২৬ পিএম

সাজেকের অবরোধে বিপর্যস্ত পর্যটন অর্থনীতি

রাঙামাটি সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ১২:২৬ পিএম

সাজেকের অবরোধে বিপর্যস্ত পর্যটন অর্থনীতি

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে সংকট নিরসনে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ ঝুলে গেছে। পাঁচ দফা দাবির চারটিতে সমঝোতার অগ্রগতি হলেও মূল বিরোধের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় প্রত্যাহার হয়নি অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ। ফলে চতুর্থ দফায় অবরোধ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর থেকে সাজেকের পর্যটন, পরিবহণ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

অবরোধের কারণে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে সাজেকের রিসোর্ট, কটেজ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা। পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহেও সংকট তৈরি হয়েছে। তবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহণ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে অবরোধ শিথিলের ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারী দুটি সংগঠন। জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্সসহ কয়েক ধরনের যানবাহনের চলাচলেও আগে থেকেই বিশেষ ছাড় রয়েছে।

কৃষিপণ্য ও শিক্ষার্থীদের যানবাহন অবরোধের আওতামুক্ত
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই সংগঠনের যৌথসভায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহণ এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বহনকারী যানবাহন অবরোধের আওতামুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সাজেকের পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে কৃষক ও কৃষিপণ্যের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এর আগে জরুরি প্রয়োজনে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, বিদ্যুৎ সরবরাহের গাড়ি, ধর্মীয় ও বিয়ের কাজে ব্যবহৃত যানবাহন এবং সাংবাদিকদের গাড়ি চলাচলে বিশেষ শিথিলতা দেওয়া হয়েছিল। তবে পাঁচ দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

চার দাবিতে সমঝোতা, মূল বিরোধে আটকে আলোচনা
এর আগে ২৬ অক্টোবর উজোবাজারে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধি দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে পাঁচ দফা দাবির চারটিতে সমঝোতার অগ্রগতির কথা জানানো হয়েছিল। তবে সাজেক এলাকা থেকে জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিকে কেন্দ্র করে মতপার্থক্য দেখা দেয়। ফলে আলোচনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

পরবর্তী সময়ে আরও সংলাপের আশ্বাস দেওয়া হলেও নতুন বৈঠকের কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান হয়নি। এ বিষয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান জানান, নতুন করে বৈঠকের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। তিনি আরও জানান, অবরোধের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেকভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকবে।

পর্যটন ব্যবসায় ৩৫ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা
সাজেকের পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে অবরোধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা বলেন, পর্যটক না থাকায় রিসোর্ট-কটেজ, রেস্তোরাঁ, পরিবহণ, স্থানীয় দোকানপাট ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অবরোধের কারণে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তিনি জানান, সাজেকে ১১৬টির বেশি রিসোর্ট, ১৪টি রেস্তোরাঁ এবং শতাধিক ছোট-বড় দোকান রয়েছে। টানা পর্যটকশূন্যতার কারণে ব্যবসায়ী, কটেজ মালিক ও কর্মচারীরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেকেই পুঁজি হারিয়ে কঠিন সময় পার করছেন।

খাদ্য ও ওষুধের সংকটে স্থানীয় বাসিন্দারা
অবরোধের কারণে সাজেকের সঙ্গে বাঘাইছড়ি উপজেলা সদর ও খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। এতে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অনিত্য ত্রিপুরা বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরে মজুত খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র শেষ হয়ে গেছে। রুইলুইপাড়ার পাঁচটি দোকানেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য শেষ হয়ে গেছে। অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। শিয়ালদাই মৌজার হেডম্যান ও ইউপি সদস্য জৌপেইথাং ত্রিপুরা জানান, পর্যটক না থাকায় এবং সড়ক অবরোধের কারণে স্থানীয় জুমচাষি ও ক্ষুদ্র বিক্রেতারা তাঁদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পারছেন না। এতে স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ওষুধসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতিও দেখা দিয়েছে।

চলাচল সীমিত, শান্ত রয়েছে পরিস্থিতি
এর আগে ১ নভেম্বর স্থানীয় বাসিন্দাদের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের সুবিধার্থে ১২ ঘণ্টার জন্য অবরোধ শিথিল করেছিলেন আন্দোলনকারীরা। তবে একই দিন পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটির পাল্টা অবরোধ এবং পরিবহণ মালিক-শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল সম্ভব হয়নি। ফলে অবরোধ শিথিলের উদ্যোগেও জনদুর্ভোগ কমেনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

১ নভেম্বর একদিন শিথিলের পর ২ নভেম্বর থেকে নতুন করে অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেন সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতাকর্মীরা। মঙ্গলবারও সাজেক পর্যটন সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। এতে যানবাহন চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানান, অবরোধের কারণে সড়কে বড় ধরনের যানবাহন চলাচল করছে না। মাঝেমধ্যে কয়েকটি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ রয়েছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

সংলাপের অগ্রগতি থমকে থাকা এবং অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় সাজেকের পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একদিকে ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটে ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

Link copied!