Kaler Alo
শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
১৫ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ০৮:৩৪ পিএম

ক্ষমতা থাকবে, স্বেচ্ছাচারিতা নয়—রাষ্ট্র সংস্কারে নতুন বার্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ০৮:৩৪ পিএম

ক্ষমতা থাকবে, স্বেচ্ছাচারিতা নয়—রাষ্ট্র সংস্কারে নতুন বার্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

একটি সরকার ক্ষমতায় আসবে, রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, কিন্তু সেই ক্ষমতা কখনোই স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত হবে না—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার এমন নিশ্চয়তা চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর মতে, শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরতান্ত্রিক বা ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার জন্ম না হয়।

এ জন্য সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার স্থায়ী আইনি কাঠামো এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে গণতন্ত্রের পাহারাদার হিসেবে কার্যকর ‘ওয়াচডগ’ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাকে সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলেও উল্লেখ করেছেন মন্ত্রী।

  • কোনো প্রতিষ্ঠানই যেন অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার মালিক না হয়,
  • বিচারকদের জবাবদিহিসহ চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স প্রতিষ্ঠার তাগিদ
  • গণতন্ত্র সুরক্ষায় ওয়াচডগ প্রতিষ্ঠান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থায়ী আইনি কাঠামো ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায় সরকার

শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর মনসুন থিয়েটারে আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ সেমিনার সিরিজের প্রথম পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট ও বাকশাল’ শীর্ষক এ আলোচনায় উঠে আসে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো, একদলীয় শাসনব্যবস্থা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রসঙ্গ।

শুধু স্বাধীনতা নয়, ক্ষমতার জবাবদিহিও চাই
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানকেই সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী হতে না দেওয়ার প্রশ্ন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিচারকদের কেবল স্বাধীনতা দিলেই হবে না, আইনের মাধ্যমে তাঁদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যেন অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে নিজেই স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে না পারে, সেই ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রেও ঐকমত্য ও সমঝোতাকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে সংশোধনগুলো টেকসই হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স প্রতিষ্ঠিত হয়।

উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, নির্বাচনী ব্যবস্থায় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতি এবং গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের বিষয়ে বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, জাতীয় অভিপ্রায় বা ‘People's Will’ যেন রাষ্ট্র পরিচালনার ধারায় প্রতিফলিত হয়, সে অনুযায়ী রাজনৈতিক কাঠামো সাজানো প্রয়োজন।

বাকশাল থেকে পঞ্চদশ সংশোধনী, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিধান থাকার পরও ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, এই পদক্ষেপ দেশের সাংবিধানিক সংকট ও স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করে।

মন্ত্রী আরও বলেন, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা ছিল বাকশাল-পরবর্তী বাংলাদেশের গণতন্ত্র ধ্বংস এবং ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থানের অন্যতম মূল কারণ। পরবর্তী সময়ে এই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রেক্ষাপট ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করে। ওই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটায়। তাঁর বক্তব্যে অতীতের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।

প্রতিহিংসা নয়, সমঝোতার রাজনীতি
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা বিভাজনের পক্ষে নন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা এবং তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে রাজনৈতিক দল ও জনগণের পারস্পরিক ঐক্য এবং রাজনৈতিক সমঝোতা অপরিহার্য।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। আলোচনায় অংশ নেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান।

আলোচনার কেন্দ্রীয় বার্তাটি ছিল—গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কেবল নির্বাচনের ওপর নির্ভর করে না; রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও ক্ষমতার সীমারেখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকার বদলালেও যেন স্বৈরতন্ত্র ফিরে আসার সুযোগ না থাকে, সেই প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা তৈরিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

কালের আলো/ওয়াইএ/এমকে

Link copied!