কালের আলো ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম

সরকারি চাকরিতে ৫ লাখ পদ খালি, নিয়োগে বড় তোড়জোড়

কালের আলো ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম

সরকারি চাকরিতে ৫ লাখ পদ খালি, নিয়োগে বড় তোড়জোড়

সরকারি চাকরিতে লাখ লাখ পদ খালি, অন্যদিকে চাকরির অপেক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ। জনবলসংকটে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কাজের চাপ বাড়ছে, ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে নাগরিকসেবা। এই পরিস্থিতিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদ পূরণে নিয়োগ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কোন দপ্তরে কত পদ খালি, কোথায় নিয়োগ আটকে আছে এবং কোন পদে নিয়োগের অনুমোদন রয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব সংগ্রহ ও যাচাই চলছে। পাশাপাশি নিয়োগবিধি সংশোধন এবং প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

  • অনুমোদিত পদের প্রায় ২৬ শতাংশ শূন্য—সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দপ্তর-অধিদপ্তরে
  • নিয়োগের তথ্য যাচাই, সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ও বিধিমালা সংস্কারে উদ্যোগ সরকারের
  • নিয়োগের হালনাগাদ হিসাব সংগ্রহ করে দ্রুত পদ পূরণের পরিকল্পনা

সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে উপস্থাপিত কার্যপত্র ও অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি। এর বিপরীতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। শূন্য রয়েছে ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ। অর্থাৎ, অনুমোদিত পদের প্রায় প্রতি চারটির একটিই খালি। বিপুল এই শূন্যতা পূরণে এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধীন সংস্থাগুলোর নিয়োগ কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

দপ্তর-অধিদপ্তরেই খালি ৩ লাখের বেশি পদ
শূন্য পদের সবচেয়ে বড় অংশ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও অধিদপ্তরে। এসব প্রতিষ্ঠানে খালি রয়েছে ৩ লাখ ১ হাজার ১৫২টি পদ। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনগুলোয় শূন্য পদের সংখ্যা ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩৮৪। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ৬ হাজার ৮০৮টি এবং বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ১৪ হাজার ৫৭৮টি পদ খালি রয়েছে। এই পরিসংখ্যান বলছে, জনবলসংকট শুধু সচিবালয় বা কেন্দ্রীয় প্রশাসনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সরকারের বিস্তৃত দাপ্তরিক কাঠামোজুড়েই রয়েছে শূন্যতার চাপ। ফলে নিয়োগ কার্যক্রমে অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের দপ্তর, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং জনসাধারণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত সংস্থাগুলোর চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

নিম্ন গ্রেডের পাশাপাশি কর্মকর্তা পর্যায়েও ঘাটতি
গ্রেডভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ৮২ হাজার ২১৬টি পদ খালি রয়েছে ২০তম গ্রেডে। ১৬তম গ্রেডে শূন্য ৭৯ হাজার ৮৬৮টি এবং দশম গ্রেডে ৬৮ হাজার ৪১৩টি পদ। এ ছাড়া ১১তম গ্রেডে ৫২ হাজার ৬২৪টি এবং নবম গ্রেডে ৪৯ হাজার ৯৮৪টি পদ শূন্য রয়েছে। নবম গ্রেডে বিসিএসের মাধ্যমে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ১৩তম গ্রেডে ৪২ হাজার ৩৫টি, ১৪তম গ্রেডে ৩০ হাজার ৫০৫টি, ১৫তম গ্রেডে ২৭ হাজার ১৩৪টি, ১৯তম গ্রেডে ২৩ হাজার ৮৭৯টি এবং ১৭তম গ্রেডে ২০ হাজার ৯৬৮টি পদ খালি রয়েছে।নিম্ন গ্রেডে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকায় দাপ্তরিক ও সহায়ক কার্যক্রমে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে নবম গ্রেডসহ কর্মকর্তা পর্যায়ে শূন্যতা থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তদারকি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে।

শূন্য পদের তালিকা ধরে নিয়োগের পরিকল্পনা
শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে হালনাগাদ তথ্য চাওয়া হয়েছে। কোন পদে নিয়োগের অনুমোদন রয়েছে, কোথায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে এবং কোন নিয়োগ প্রক্রিয়া কী পর্যায়ে আছে—এসব তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।

এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে শূন্য পদের তালিকা, অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামো এবং চলমান নিয়োগ কার্যক্রমের তথ্য জরুরি ভিত্তিতে পাঠাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সব মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তর-সংস্থার ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের শূন্য পদের তালিকা ধরে একটি সময়াবদ্ধ নিয়োগ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগেও পাঠানো হয়েছে।

আগামী অর্থবছরে ৪ হাজার ৪৫৯ পদে নিয়োগের লক্ষ্য
নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, এর অধীন দপ্তর-সংস্থা এবং মাঠ প্রশাসনে নতুন নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে ৪ হাজার ৪৫৯টি শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই লক্ষ্যমাত্রা দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের মোট শূন্য পদের জন্য নয়; এটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও এর আওতাধীন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের পরিকল্পনা। ফলে সামগ্রিকভাবে ৫ লাখের বেশি শূন্য পদ পূরণে অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থার নিয়োগ পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে, সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনার অগ্রগতি প্রতিবেদনে নিয়োগ ও পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে মাঠ প্রশাসনে ৯৮১টি, দপ্তর-সংস্থায় ১ হাজার ৪৫টি এবং মন্ত্রণালয়ে ৩৫টি পদের বিপরীতে নিয়োগের তথ্যের পাশাপাশি ২৬১টি শূন্য পদে নিয়োগ ও প্রায় ৮৬ শতাংশ অর্জনের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব সংখ্যার পারস্পরিক সম্পর্ক স্পষ্ট নয়। তাই মোট লক্ষ্যমাত্রা, নিয়োগ সম্পন্ন হওয়া পদের সংখ্যা এবং অর্জনের হার পৃথকভাবে প্রকাশ করা হলে অগ্রগতি মূল্যায়ন সহজ হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তর-সংস্থায় ৪৭ হাজার ৩২৬টি পদ সৃজন, ১৮ হাজার ৮৯৩টি পদ সংরক্ষণ এবং ২৯৩টি পদ স্থায়ীকরণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্মতি দিয়েছে। তবে পদ সৃজন বা সংরক্ষণকে সরাসরি নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার সমতুল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এসব পদের নিয়োগযোগ্যতা ও পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে।

নিয়োগবিধি সংস্কার ও সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়নের উদ্যোগ
শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি নিয়োগ ও পদোন্নতির কাঠামোগত জটিলতা দূর করতে ‘কমন নিয়োগ বিধিমালা ২০১৯’ যুগোপযোগী করার কাজ চলছে। মৎস্য অধিদপ্তর, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়ের জন্য ১৭টি নতুন নিয়োগবিধি ও প্রবিধানমালা প্রণয়ন অথবা সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে।

পাশাপাশি সরকারি চাকরি (সংশোধন) আইন, ২০২৬ এবং বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণসংক্রান্ত আইন প্রণয়নের কার্যক্রম চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অংশ হিসেবে সংবিধানের আলোকে সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত ১৩ জুলাই গঠিত কমিটি কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

Link copied!