ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালী এক নাম। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থেকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি যেমন বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, তেমনি তাঁর শাসনামল নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণে সাফল্যের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সংকট, ধর্মীয় বিভাজন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।
সম্প্রতি ভারতের তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভ ও বিক্ষোভ মোদির নেতৃত্বের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, চাকরির সুযোগ এবং নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে আন্দোলনকারীদের দাবিতে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ শাসনামলের অর্জন ও ব্যর্থতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তরুণদের ক্ষোভে চাপে মোদি সরকার
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভারতে বিক্ষোভ শুরু হয়। একপর্যায়ে সেই আন্দোলন মোদিবিরোধী প্রতিবাদে রূপ নেয়। শিক্ষার্থী, তরুণ আন্দোলনকারী ও বিরোধী দলগুলো বিজেপির বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তোলে। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং কর্মসংস্থানের দাবি জানায় তারা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। দিল্লিতে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, ট্রেন চলাচল বাতিল এবং বিভিন্ন সড়কে বাধা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগ ও আটকের ঘটনাও সামনে আসে। এসব ঘটনার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমালোচনা তৈরি হয়।
বয়স্ক ভোটারদের মধ্যে মোদির জনপ্রিয়তা এখনো রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতাও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে কিছুটা শক্তিশালী রেখেছে। তবে তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা অসন্তোষ তাঁর নেতৃত্বের জন্য বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গুজরাট থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উত্থান
২০০১ সালের জানুয়ারিতে ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত হয় গুজরাট। ওই বছরের অক্টোবর মাসে রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান নরেন্দ্র মোদি। এর আগে প্রশাসনিক পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি দ্রুত রাজ্য রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
২০০২ সালে গুজরাটে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। একটি ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের মৃত্যুর পর শুরু হওয়া সহিংসতায় এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান বলে বিভিন্ন হিসাবে উল্লেখ করা হয়। দাঙ্গা মোকাবিলায় মোদি সরকারের ভূমিকা নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
তবে রাজনৈতিকভাবে সেই বিতর্ক তাঁর উত্থান থামাতে পারেনি। পরবর্তী নির্বাচনে জয় পেয়ে গুজরাটের ক্ষমতায় টানা অবস্থান বজায় রাখেন তিনি। পরে জাতীয় রাজনীতিতেও নিজের প্রভাব বিস্তার করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হিন্দুত্ববাদী আদর্শ, শক্তিশালী নেতৃত্বের ভাবমূর্তি এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়েই মোদি তাঁর জনপ্রিয়তার ভিত্তি তৈরি করেন।
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও বিজেপির বিস্তার
গুজরাটে ব্যবসাবান্ধব নীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের সমন্বয়ে নিজের রাজনৈতিক মডেল প্রতিষ্ঠা করেন মোদি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেই মডেল জাতীয় পর্যায়েও প্রয়োগের চেষ্টা করেন তিনি।
তাঁর শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরের প্রভাব বেড়েছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ। মন্ত্রিসভা ও রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণও আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। বিরোধীদের মতে, এতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমেই কয়েকটি কেন্দ্রের হাতে জমা হয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপির রাজনৈতিক বিস্তারও উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন রাজ্যে দলটির সরকার প্রতিষ্ঠা এবং সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির ফলে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে। তবে এই বিস্তারের পাশাপাশি জনমনে অসন্তোষও বাড়ছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কিন্তু কর্মসংস্থানে হতাশা
অর্থনীতির ক্ষেত্রে মোদি সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা, অনলাইন লেনদেন, পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) এবং অবকাঠামো উন্নয়ন। মহাসড়কের সম্প্রসারণ, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া, খাদ্যশস্য বিতরণ এবং সরাসরি ব্যাংক হিসাবে সরকারি সহায়তা পাঠানোর মতো কর্মসূচিও তাঁর সরকারের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।
ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বার্ষিক প্রায় ৬ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি—এমন অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সম্পদ বৃদ্ধির বিপরীতে গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের আয় বৃদ্ধির গতি ছিল তুলনামূলক ধীর। বেতনভোগী কর্মীদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিল্পায়ন ও বড় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি থাকলেও পর্যাপ্ত স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি বলে সমালোচকদের দাবি।
ভারতের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও শিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্মত চাকরির সংকট রয়ে গেছে। কৃষি ও জমিসংক্রান্ত আইন নিয়ে আন্দোলনের মুখে সরকারকে পিছু হটতেও হয়েছে। এসব বিষয় তরুণ ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে।
হিন্দুত্ববাদ ও সামাজিক বিভাজন
মোদি সরকারের শাসনামলে ভারতের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের প্রভাব আরও বেড়েছে। সমালোচকদের মতে, ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের প্রবণতা সমাজে বিভাজন তৈরি করেছে। বিশেষ করে দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধনকে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অন্যতম প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। নাগরিকত্ব আইন ও পারিবারিক আইন নিয়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এ ছাড়া ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তব্য, সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে হামলা এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনা নিয়ে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা হয়েছে। বড় আকারের দাঙ্গার ঘটনা কমে এলেও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে।
তরুণ ভোটারদের মনোভাব বদলাচ্ছে
কর্মসংস্থানের সংকট ও অর্থনৈতিক বৈষম্য তরুণ ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরির অন্যতম কারণ। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে জোটের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের একাংশের সমর্থন কমে যাওয়াও এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
ভারতের ভোটারদের একটি বড় অংশ তরুণ। তাঁদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে বিজেপির জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা, চাকরি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো তরুণদের ভোটের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
গণতন্ত্র ও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
মোদির শাসনামল নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি হলো ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা। বিরোধী দল ও সমালোচকদের অভিযোগ, সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে মামলা, সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ গণতান্ত্রিক পরিবেশকে সংকুচিত করেছে।
বিশেষ করে ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং অনেক প্রকৃত ভোটার নিজেদের ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। যেসব নাম বাদ পড়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথির ঘাটতি বা তথ্যগত অসংগতি ছিল। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, এত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া কেন দ্রুত এবং পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ছাড়াই পরিচালিত হলো।
ভোটার তালিকা সংশোধনের কারণে নির্বাচনের ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে—এমন প্রমাণের বিষয়টিও আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ভোটারদের আপত্তি জানানোর সুযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সামনে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা
মোদির দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় উন্নয়ন, শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর সরকারের আমলে অবকাঠামো ও ডিজিটাল সেবায় অগ্রগতি হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের ঘাটতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধর্মীয় বিভাজন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কও বেড়েছে।
বিরোধী দলগুলো এখনো মোদির বিকল্প হিসেবে শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সুসংগঠিত কর্মসূচি সামনে আনতে পারেনি। তবে তরুণদের ক্ষোভ, অর্থনৈতিক প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা এবং নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক তাঁর সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
দীর্ঘ শাসনের অর্জন ধরে রাখতে হলে শুধু ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা যথেষ্ট নয়; মানুষের প্রত্যাশা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও জরুরি। ভারতের রাজনীতিতে মোদির ভবিষ্যৎ অবস্থান অনেকটাই নির্ভর করবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাঁর সরকারের সক্ষমতার ওপর।
কালের আলো/এসএ/জেএন
