সীমান্তের ওপারে কে যাচ্ছে, কে আসছে—এই হিসাব রাখাই একসময় ছিল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রধান কাজ। এখন সেই হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও অনেক প্রশ্ন। যাত্রীর পরিচয় কতটা নির্ভরযোগ্য, ভ্রমণের উদ্দেশ্য কী, পণ্য পরিবহনের আড়ালে কোনো অপরাধ ঘটছে কি না, মানব পাচার বা অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি কোথায় তৈরি হচ্ছে—এসবের উত্তরও চাইছে আধুনিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তার ভাবনাতেও সেই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট হচ্ছে। কেবল পাহারা ও নিয়ন্ত্রণ নয়, এবার গুরুত্ব পাচ্ছে প্রযুক্তি, তথ্যের সমন্বয়, দক্ষ জনবল এবং মানবিক সুরক্ষা। বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও অভিবাসন তল্লাশিচৌকিতে সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
- মানব পাচার, পরিচয় জালিয়াতি ও আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ব্যবস্থাপনা
- বৈধ যাতায়াত ও বাণিজ্য সচল রেখে সীমান্ত সুরক্ষায় ২০২৭-২০৩১ সালের পরিকল্পন
এই পরিবর্তনের লক্ষ্য একদিকে সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে বৈধ যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের চলাচলে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আধুনিক, সমন্বিত ও প্রযুক্তিভিত্তিক নিরাপদ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত করতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকার হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের মেঘনা হলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে অভিবাসন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা: কৌশলগত রূপরেখা ২০২৭-২০৩১’ শীর্ষক ব্রিফিং অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ অবস্থানের কথা তুলে ধরেন।

নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনীতির প্রবেশপথও সীমান্ত
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে—নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন বৈধ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত না হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক যাতায়াত ও বাণিজ্য সহজতর করার পাশাপাশি সীমান্ত অতিক্রমকারী ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানের অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার ইতোমধ্যে ‘জাতীয় সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কৌশল ২০২৬-২০৩১’ এবং ‘পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন রূপরেখা ২০২৬-২০৩১’ গ্রহণ করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ডিজিটাল রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার, কাগজবিহীন প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সরকারি সেবাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধি বর্তমান সরকারের মূল অগ্রাধিকার।
নজরদারির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে তথ্যের সমন্বয়
সীমান্তে নিরাপত্তার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে। কারণ, বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করা সংস্থাগুলোর হাতে তথ্য থাকলেও সেগুলোর সমন্বিত ব্যবহার না হলে ঝুঁকি শনাক্ত ও মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়ে।

ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নীতি ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আমাদের বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও অভিবাসন তল্লাশিচৌকিগুলোর কার্যক্রমগত সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করতে হবে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে মানবিক বিবেচনাও যুক্ত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে কেবল প্রযুক্তিনির্ভর না করে মানবিক অধিকার ও সুরক্ষার প্রতি সংবেদনশীল এবং পেশাদার মানদণ্ডে উন্নীত করতে হবে।
মানব পাচার ও আন্তসীমান্ত অপরাধে সমন্বিত প্রতিরোধের তাগিদ
সীমান্ত অতিক্রমকারী অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে। মানব পাচার, অবৈধ অভিবাসন ও বহুজাতিক অপরাধ মোকাবিলায় তাই শুধু সীমান্তে দায়িত্বরত বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সম্মিলিত উদ্যোগ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কোনো একক সংস্থার দায়িত্ব নয়। এর জন্য সকল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ প্রয়াস প্রয়োজন। এই সমন্বয়ের সঙ্গে পরিচয় জালিয়াতি শনাক্তকরণ, তথ্য বিনিময় এবং দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়গুলোও যুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ সীমান্ত নিরাপত্তার নতুন কাঠামোতে অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

চার স্তম্ভে সাজানো হচ্ছে আগামী পাঁচ বছরের সহযোগিতা
বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে ২০২৭-২০৩১ মেয়াদের একটি কৌশলগত রূপরেখা সামনে এনেছে আইওএম। এতে সম্ভাব্য সহযোগিতার চারটি ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্ষেত্রগুলো হলো সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল ব্যবস্থা ও তথ্য আদান-প্রদান, প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নির্বাচিত সীমান্ত পয়েন্টে অবকাঠামো ও সেবার উন্নয়ন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইওএমের প্রস্তাবিত কৌশলগত রূপরেখাকে স্বাগত জানান। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের সীমান্ত কাঠামো গঠনে সংস্থাটির সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোকে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কেবল বাংলাদেশের সীমান্তকেই সুরক্ষিত করবে না, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপদ বিশ্বায়নে বড় অবদান রাখবে।
অগ্রগতির স্বীকৃতি, আরও সক্ষমতা তৈরির প্রত্যাশা
আইওএম বাংলাদেশ মিশনের প্রধান ড. লরা টম বন্ডে বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘অভিবাসন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ভ্রমণের ধরন ও কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর ব্যবস্থা, দক্ষ জনবল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও ভালো সমন্বয়ের প্রয়োজন বাড়বে। কারিগরি দক্ষতা ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে সরকারের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে আইওএম সহযোগিতা করতে আগ্রহী।’
ব্রিফিং অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, রাজনৈতিক-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব রেবেকা খান, পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. কামরুল আহসান এবং উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং এবং ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রোসহ বিভিন্ন অংশীদার সংস্থার প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন। বৈধ যাতায়াত ও বাণিজ্য সহজ করার পাশাপাশি মানব পাচার, আন্তসীমান্ত অপরাধ এবং পরিচয় জালিয়াতির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপায় নিয়ে মতবিনিময় হয়। আইওএমের প্রস্তাবিত রূপরেখা তৈরিতে সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন রূপরেখা (জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১) বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
কালের আলো/এমএএএমকে
