Kaler Alo
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬
১৮ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম

সংসদে মিত্র, ভোটের মাঠে প্রতিপক্ষ!

কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম

সংসদে মিত্র, ভোটের মাঠে প্রতিপক্ষ!

জাতীয় নির্বাচনে একসঙ্গে লড়াই, সংসদে অভিন্ন অবস্থান, রাজপথেও যৌথ কর্মসূচি—সবকিছুতেই ঐক্যের প্রতিশ্রুতি ছিল ১১ দলীয় জোটের। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রশ্নে সেই ঐক্যের ভেতরেই দেখা দিয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। জাতীয় নির্বাচনের মিত্ররা এখন স্থানীয় নির্বাচনে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জোটের বৃহত্তম দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ে এককভাবে নির্বাচনে নামতে চায়। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় ও স্বতন্ত্র শক্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে পাল্টাপাল্টি মেয়র প্রার্থী ঘোষণা দুই দলের মধ্যকার দূরত্বকে প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ দিয়েছে।

  • জামায়াতের একলা চলার কৌশলে অস্বস্তিতে শরিকরা 
  • ঢাকার দুই সিটিতে মুখোমুখি জামায়াত-এনসিপি
  • নতুন ইসলামি জোটে বদলে যাচ্ছে ১১ দলের রাজনৈতিক হিসাব

প্রকাশ্যে অবশ্য কেউ জোটের বিরোধের কথা স্বীকার করছে না। জামায়াত বলছে, ঐক্য অটুট আছে। এনসিপির বক্তব্য, জাতীয় পর্যায়ে জোটের কার্যক্রম চলবে, তবে স্থানীয় নির্বাচনে প্রত্যেক দল নিজেদের মতো লড়বে। কিন্তু দল দুটির সাম্প্রতিক বক্তব্য, কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং প্রার্থী ঘোষণার ঘটনাপ্রবাহ বলছে, জোটের ভেতরে রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। শরিকদের মধ্যে বাড়ছে সমঝোতার তাগিদ, আর জামায়াতের অবস্থানে স্পষ্ট হচ্ছে নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি প্রতিষ্ঠার আগ্রহ।

সবচেয়ে বড় বিরোধের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে মেয়র প্রার্থী করেছে এনসিপি। অন্যদিকে জামায়াত দক্ষিণে আবু সাদিক কায়েম এবং উত্তরে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। দুই দলের ঘোষিত প্রার্থীদের কেউই এখন পর্যন্ত সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেননি। ফলে জাতীয় নির্বাচনের মিত্ররা এবার রাজধানীর দুই গুরুত্বপূর্ণ নগর নির্বাচনে পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জোটের একাধিক সূত্রের দাবি, মেয়র পদে প্রার্থী সমঝোতা নিয়ে আলোচনা থেকেই জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে টানাপড়েনের সূত্রপাত। এনসিপি চেয়েছিল ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দুই পদে নিজেদের প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে। জামায়াতও কোনো পদ ছেড়ে দিতে আগ্রহী নয়। দুই পক্ষের অনড় অবস্থানে সমঝোতার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়েছে। শুধু ঢাকা নয়, কুমিল্লা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়েও দুই দলের মধ্যে ঐকমত্য হয়নি।

জামায়াতের হিসাব তৃণমূল, এনসিপির লক্ষ্য স্বতন্ত্র পরিচয়
জামায়াতের নেতাদের যুক্তি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক পদে কেন্দ্রীয়ভাবে জোটগত সমঝোতা করা কঠিন। এ ছাড়া এককভাবে নির্বাচন করলে তৃণমূল পর্যায়ে দলের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক সামর্থ্য ও জনসমর্থনের চিত্র স্পষ্ট হবে। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশনের মেয়র পর্যন্ত বিভিন্ন পদে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ১১ দলের ঐক্য অটুট রয়েছে। সবাই একসঙ্গে কাজ করছে, কোনো ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীকে হয় না, তাই প্রত্যেক দল নিজস্বভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কোথাও জোটগত সমঝোতার প্রয়োজন দেখা দিলে কেন্দ্রীয় নেতারা বসে সিদ্ধান্ত নেবেন।

দলটির আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে জোটগত সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেই। তবে জেলা, উপজেলা কিংবা নির্দিষ্ট এলাকায় শরিকেরা আলোচনা করে একক প্রার্থী নির্ধারণ করলে কেন্দ্র তাতে বাধা দেবে না।

অন্যদিকে, এনসিপির কাছে স্থানীয় নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের লড়াই নয়, নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রমাণেরও সুযোগ। দলটির নেতাদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন জামায়াতের রাজনৈতিক বলয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকলে স্বতন্ত্র দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে জোটের যৌথ কর্মসূচির পাশাপাশি নিজস্ব সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে চাইছে তারা।

এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব সারজিস আলম জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোট হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দুই দল পৃথকভাবে লড়বে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবেন। দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের বক্তব্য, স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত জোটগতভাবেই হয়েছে। এতে জোটের ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

কর্মসূচিতে দূরত্ব, বক্তব্যে বাড়ছে অসন্তোষ
নির্বাচনী সমঝোতার বাইরে দুই দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নেতাদের বক্তব্যেও মতপার্থক্য সামনে আসছে। গত ৩০ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগে জামায়াতকে ছাড়াই গণবিক্ষোভ সমাবেশ করে এনসিপি। পরদিন ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতি নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়।

যদিও এনসিপির নেতারা জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি এবং পরবর্তী পথসভাগুলোতে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নিয়েছেন। তবে লংমার্চের একটি পথসভায় জামায়াত আমিরের সামনেই দলটির অবস্থানের সমালোচনা করে বক্তব্য দেন এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। এ ঘটনা দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এবং এ বিষয়ে জামায়াতের প্রতিক্রিয়া নিয়েও এনসিপির মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। শাহবাগের সমাবেশে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বক্তব্যেও জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এনসিপি এখন জোটের যৌথ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ সীমিত রেখে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়াতে চায়। কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের পর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ মহানগর এবং থানা পর্যায়ে কমিটি গঠনের প্রস্তুতি চলছে। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে সমাবেশের পরিকল্পনাও রয়েছে। তৃণমূলে সংগঠন বিস্তারের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জাতীয় নির্বাচনের জন্য ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি ও পোলিং এজেন্ট তৈরির বিষয়টিও তাদের বিবেচনায় রয়েছে।

নতুন ইসলামি জোটে বাড়ছে নতুন সমীকরণ
১১ দলীয় জোটের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনের মধ্যেই কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। হেফাজতে ইসলামসহ কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে এই প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে ১১ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নতুন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে কয়েকটি দলকে ১১ দলীয় জোট ছাড়ার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সেই শর্তে রাজি হয়নি। দলটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ জানিয়েছেন, সাত দলের পক্ষ থেকে জোট ছাড়ার শর্ত দেওয়া হলেও তারা তা গ্রহণ করেননি। ১১ দলীয় জোটে তাদের অবস্থান বহাল রয়েছে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকও ১১ দলের ঐক্য অটুট রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ঐক্য কমবে না, বরং আরও বিস্তৃত হবে। কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের ফাঁদে পা দেবেন না তাঁরা। আগামী ডিসেম্বরে সাত দলের সম্ভাব্য বৈঠকে নতুন প্ল্যাটফর্মের রাজনৈতিক না অরাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

ঐক্যের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
জোটের শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান অবশ্য জোট ভাঙার আশঙ্কা দেখছেন না। তাঁর মতে, কোনো দলের বেরিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী সমঝোতা নিয়ে শরিকদের মধ্যে যে আলোচনা ও দর-কষাকষি চলছে, তা জোটের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

রাজনৈতিকভাবে ১১ দলীয় জোট এখন এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। জাতীয় সংসদ ও রাজপথে একসঙ্গে থাকার ঘোষণা থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে প্রত্যেক দল নিজেদের শক্তি ও অবস্থান প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় নামছে। জামায়াত চাইছে তৃণমূল থেকে নগর পর্যায় পর্যন্ত নিজেদের সাংগঠনিক বিস্তার যাচাই করতে। এনসিপি চাইছে জোটের পরিচয়ের বাইরে নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান দৃশ্যমান করতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কওমি ঘরানার নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগ।

ফলে সামনে বড় প্রশ্ন—স্থানীয় নির্বাচনে মিত্রদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি কেবল নির্বাচনী কৌশলেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে? সংসদে অভিন্ন অবস্থান বজায় রেখেও নির্বাচনী মাঠে পৃথক শক্তি প্রদর্শনের এই কৌশল কত দিন সমান্তরালভাবে চলবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কালের আলো/জেএন/এমকে

Link copied!