বিদেশি ফল প্যাশন ফ্রুট বা আনারকলি চাষ করে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর তরুণ উদ্যোক্তা রায়হান আহমেদ রিপন। বাড়ির আঙিনায় মাত্র দুটি চারা রোপণ করে সাত মাসের মধ্যে পেয়েছেন প্রায় এক হাজার ফল। তাঁর বাগানের ফল দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। নতুন এ ফলের চাষ দেখে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে আগ্রহ।
ফুলবাড়ী পৌর এলাকার সুজাপুর বানিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রিপনের বয়স ৩৩ বছর। পেশায় ফ্রিল্যান্সার হলেও কৃষিতে নতুন কিছু করার আগ্রহ থেকে শুরু করেন আনারকলি চাষ। কয়েক বছর আগে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে প্রথম প্যাশন ফ্রুটের স্বাদ নেন তিনি। ফলটির টক-মিষ্টি স্বাদ ভালো লাগায় সেখান থেকে বীজ সংগ্রহ করে বাড়িতে রোপণ করেন। তবে প্রথমবার সফলতা পাননি। পরে গত বছরের ডিসেম্বরে পরিচিত একজনের মাধ্যমে কক্সবাজার থেকে ৯০০ টাকায় দুটি চারা সংগ্রহ করেন রিপন। বাড়ির আঙিনায় চারা দুটি রোপণের পর ইউটিউব দেখে শুরু করেন পরিচর্যা। তাঁর যত্নে সাত মাসের মধ্যেই মাচাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে লতাগাছ। গাছে ধরে প্রচুর ফল।
দুই চারায় ফলেছে প্রায় এক হাজার আনারকলি
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির সামনের প্রায় চার শতাংশ জায়গাজুড়ে তৈরি করা মাচায় ঝুলছে শত শত সবুজ আনারকলি। ফল দেখতে আসা দর্শনার্থীদের শুধু ফল খাওয়াচ্ছেন না, চাষপদ্ধতি ও পরিচর্যার বিভিন্ন দিকও বুঝিয়ে দিচ্ছেন রিপন। পাশাপাশি আগ্রহীদের জন্য নিজেই উৎপাদন করছেন আনারকলির চারা।
রিপন জানান, বাজারে প্রতিটি ফল প্রায় ৫০ টাকা এবং প্রতি কেজি প্রায় ৬০০ টাকা দরে বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে পাইকারেরাও তাঁর বাড়িতে এসে ফল কেনার আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে আপাতত ফল বিক্রির চেয়ে চাষ সম্প্রসারণের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন তিনি। এরই মধ্যে তিন শতাধিক চারা উৎপাদন করেছেন রিপন। প্রতিটি চারা বিক্রি করছেন ৩০০ টাকায়। বাণিজ্যিকভাবে আনারকলি চাষের পরিকল্পনা থেকে নিজের এক বিঘা জমিতে চারা রোপণের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তিনি।
কম রোগবালাই, দীর্ঘদিন ফল দেওয়ার সম্ভাবনা
রিপনের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, আনারকলি গাছে রোগবালাইয়ের প্রকোপ তুলনামূলক কম। প্রয়োজনীয় জৈব সার, ছত্রাকনাশক ও ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করে গাছের পরিচর্যা করা যায়। ফুল ফোটার পর হাতে পরাগায়ন করলে ফল ধারণের হার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তিনি জানান, শীতের তিন মাস বাদে বছরের অধিকাংশ সময় গাছে ফল পাওয়া যায়। একটি গাছ প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত ফল দিতে পারে। এসব বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।
স্থানীয়দের মধ্যেও বাড়ছে আগ্রহ
বাগান দেখতে আসা প্রতিবেশী মুক্তি চক্রবর্তী বলেন, আগে ফেসবুকে আনারকলি সম্পর্কে দেখেছেন। এখন বাড়ির পাশেই ফলটি দেখতে ও খেতে পারছেন। স্থানীয় মাটিতে গাছের ভালো বৃদ্ধি এবং প্রচুর ফল দেখে তিনিও এ ফল চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
বাণিজ্যিক চাষে লাভের সম্ভাবনা দেখছে কৃষি বিভাগ
ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফ আব্দুল্লাহ মোত্তাকিন জানান, প্যাশন ফ্রুট দক্ষিণ আমেরিকার একটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু লতানো ফল। বাংলাদেশে এটি আনারকলি নামে পরিচিত। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ‘বারি প্যাশন ফল-১’ একটি জনপ্রিয় জাত। তিনি বলেন, এ ফলে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, খাদ্যআঁশ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা গেলে কৃষকেরা লাভবান হতে পারেন।
ফুলবাড়ীতে প্রথমবারের মতো এ ফল চাষের খবর পেয়েছেন জানিয়ে কৃষি কর্মকর্তা বলেন, শিগগিরই সরেজমিনে রিপনের বাগান পরিদর্শন করে চাষের সম্ভাবনা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে। দুটি চারা দিয়ে শুরু হওয়া রিপনের এই উদ্যোগ এখন বাণিজ্যিক চাষের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তাঁর বাগান ঘিরে স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহ তৈরি হওয়ায় ফুলবাড়ীতে আনারকলি চাষের নতুন সম্ভাবনাও সামনে আসছে।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
