Kaler Alo
বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬
১৯ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০১:১৬ পিএম

পোস্টমাস্টার সংকটে ধুঁকছে মানিকগঞ্জ ও সাভার

কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০১:১৬ পিএম

পোস্টমাস্টার সংকটে ধুঁকছে মানিকগঞ্জ ও সাভার

ডাকঘর রয়েছে, কিন্তু দায়িত্ব পালনের জন্য নেই প্রয়োজনীয় জনবল। কোথাও উপজেলা পোস্টমাস্টারের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য, আবার কোথাও পোস্টাল অপারেটর, পোস্টম্যান ও প্যাকার না থাকায় অন্য পদের কর্মীদের দিয়ে চলছে দৈনন্দিন কার্যক্রম। এতে ব্যাহত হচ্ছে ডাক বিভাগের স্বাভাবিক সেবা। ভোগান্তিতে পড়ছেন চিঠি ও পার্সেল পাঠাতে আসা ব্যক্তি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

ডাক বিভাগের মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলার সাভার উপবিভাগে সহকারী পরিদর্শকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ৬৫টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে মানিকগঞ্জের সাতটি উপজেলার ছয়টিতেই উপজেলা পোস্টমাস্টারের পদ ফাঁকা। অন্যদিকে সাভার, ধামরাই ও মানিকগঞ্জের সিংগাইর অঞ্চলের ডাকঘরগুলোতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য জনবলসংকট। ডাক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ডাকঘরে শুধু চিঠি আদান-প্রদান ও পার্সেল বিতরণের কাজই হয় না; এর পাশাপাশি দাপ্তরিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেনও পরিচালিত হয়। ফলে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এসব সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্মীদের।

দুই উপবিভাগে ৬৫টি পদ শূন্য
সম্প্রতি মানিকগঞ্জ, সাভার ও ধামরাইয়ের বিভিন্ন ডাকঘরের জনবলসংকটের তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোতে যোগাযোগ করা হয়। প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ায় তথ্য অধিকার আইনে ঢাকার ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলের (ডিপিএমজি) কার্যালয়ে আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের পর পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে ডাকঘরগুলোর জনবলসংকটের চিত্র উঠে এসেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় জেলার প্রধান ডাকঘরসহ মানিকগঞ্জের সাতটি উপজেলা এবং ঢাকা জেলার সাভার ও ধামরাই—এই দুই জেলায় মোট আটটি উপজেলা ডাকঘর রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ১০টি উপডাকঘর, ৫৪টি শাখা ডাকঘর, চারটি অবিভাগীয় উপডাকঘর (ইউডিএসও) এবং ৮২টি অবিভাগীয় শাখা ডাকঘর (ইডিবিও)।

ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মানিকগঞ্জ উপবিভাগের অধীন সাটুরিয়া, ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলা ডাকঘরে উপজেলা পোস্টমাস্টারের পদ শূন্য। এ ছাড়া এসব এলাকায় তিনটি সাব-পোস্টমাস্টার, পাঁচটি পোস্টাল অপারেটর, ছয়টি পোস্টম্যান, চারটি প্যাকার, চারটি রানার এবং ১১টি ইডিএর পদ খালি রয়েছে। সব মিলিয়ে এ উপবিভাগে ৩৮টি পদ শূন্য।

অন্যদিকে সাভার উপবিভাগের অধীন সাভার, ধামরাই ও মানিকগঞ্জের সিংগাইর অঞ্চলের ডাকঘরগুলোতে ২৭টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সিংগাইর উপজেলা ডাকঘরের উপজেলা পোস্টমাস্টারের পদও ফাঁকা। এ উপবিভাগে একজন সহকারী পরিদর্শক, সাতজন সাব-পোস্টমাস্টার, তিনজন পোস্টাল অপারেটর, চারজন পোস্টম্যান, চারজন প্যাকার, দুজন রানার ও পাঁচজন ইডিএর পদ শূন্য রয়েছে। দুই উপবিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের ডাকঘরে উপজেলা পোস্টমাস্টার থেকে শুরু করে চিঠি বিলি ও পরিবহণের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের ৬৫টি পদে জনবল নেই।

অন্য পদের কর্মীদের দিয়ে চলছে পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব
জনবলসংকটের কারণে এক পদের কর্মীকে অন্য পদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সাটুরিয়া উপজেলা ডাকঘরের পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব পালন করছেন পোস্টাল অপারেটর মুস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘পোস্টাল অপারেটর হয়েও আমাকে উপজেলা পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ জন্য আমাকে বাড়তি কোনো আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয় না।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপডাকঘরেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেখানে সাব-পোস্টমাস্টারের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ফলে একজন পোস্টাল অপারেটরকে দিয়ে ওই পদের দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। ডাকঘরটির দায়িত্বে থাকা পোস্টাল অপারেটর কল্যাণী রানী সাহা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমি সাব-পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব পালন করছি। এভাবে আর কত দিন চলবে, তা আমার জানা নেই।’

সাভার ডাকঘরে বাড়ছে কাজের চাপ
সাভার উপজেলা ডাকঘরে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা ও বিদেশ থেকে কয়েক শ চিঠি ও পার্সেল আসে। একইভাবে দেশের ভেতরে ও বাইরে পাঠানোর জন্যও প্রতিদিন কয়েক শ চিঠি ও পার্সেল জমা পড়ে। এসব ডাকসামগ্রী নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠানো এবং প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতে হয় সীমিত জনবল দিয়ে।

সাভার উপজেলা ডাকঘরের পোস্টমাস্টার মনোয়ারা বেগম বলেন, দেশে কুরিয়ার সার্ভিসের প্রচলন হওয়ার পর ডাকঘরমুখী মানুষের সংখ্যা অনেকটা কমে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডাকঘরের মাধ্যমে চিঠি ও পার্সেল পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে। তিনি বলেন, শুধু চিঠি ও পার্সেল আদান-প্রদান নয়, ডাকঘরে দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনও করতে হয়। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় দৈনন্দিন কাজ সামলাতে তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

মনোয়ারা বেগম জানান, সাভার উপজেলা ডাকঘরে একজন সহকারী পরিদর্শকের পদ থাকলেও সেখানে কোনো জনবল নেই। তিনটি পোস্টাল অপারেটর পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন একজন। তিনটি পোস্টম্যান পদের বিপরীতে আছেন দুজন। এ ছাড়া একজন প্যাকার থাকার কথা থাকলেও পদটিতে কোনো কর্মী নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি।

ডাকসেবা নিতে গিয়েও ভোগান্তি
ডাকঘরের জনবলসংকটের প্রভাব পড়ছে সেবাপ্রত্যাশীদের ওপরও। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চিঠি, চাকরির আবেদন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র, গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ব্যবসায়িক পার্সেল পাঠাতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন অনেকে। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার ধল্লা এলাকার অ্যাসপায়ার গার্মেন্টস লিমিটেডের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা রুবেল হোসেনকে প্রতিষ্ঠানের চিঠি রেজিস্ট্রি করতে প্রায়ই সাভার ডাকঘরে যেতে হয়।

তিনি বলেন, ‘জনবল সংকটে ডাকঘর থেকে শুধু খামে ডাকটিকিট লাগিয়ে অনলাইনে নিবন্ধনের কাজ করা হয়। আর বাকি কাজ নিজেকেই করতে হয়। কিছুদিন আগেও প্রায় ৩০০টি চিঠির রেজিস্ট্রির প্রাথমিক কাজ আমাকেই করে দিতে হয়েছে।’ সাভার ডাকঘরের পোস্টম্যান আকমল হোসেন বলেন, ‘আমার কাজ চিঠি ও পার্সেল বিলি করা। কিন্তু চিঠি ও পার্সেল বিলির পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজসহ ব্যাংকের কাজও আমাকেই করতে হয়।’

শূন্য পদ পূরণের বিষয়ে অনিশ্চয়তা
সাভার উপবিভাগের ডাকঘর পরিদর্শক মো. মিজানুর রহমান বলেন, জনবলসংকটের কারণে ডাকঘরগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। যে জনবল রয়েছে, তাঁদের দিয়েই সব কাজ চালাতে হচ্ছে। শিগগির শূন্য পদগুলো পূরণ করা হবে কি না, তা বলা যাচ্ছে না। অন্যদিকে জনবলসংকটের বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার ডাক বিভাগের মানিকগঞ্জ উপবিভাগের পরিদর্শক মো. নাঈমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদ পূরণ না হওয়ায় একদিকে ডাক বিভাগের কর্মীদের ওপর বাড়তি দায়িত্বের চাপ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সেবাপ্রত্যাশীদেরও ভোগান্তি বাড়ছে। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হলে মানিকগঞ্জ, সাভার ও ধামরাই অঞ্চলের ডাকসেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

Link copied!