ব্রহ্মপুত্র নদের বালুতে রয়েছে মূল্যবান ও বিরল খনিজ সম্পদ। এসব খনিজ আহরণ ও প্রক্রিয়াজাত করা গেলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি দেশে নতুন শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। কুড়িগ্রামে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা এবং অঞ্চলের ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কথা বলা হচ্ছে।
তবে বিপুল সম্ভাবনার এই প্রকল্প এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। মাঠপর্যায়ের তথ্য ও মন্ত্রণালয়ের নথির মধ্যে অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ও সরকারের প্রাপ্তি নিয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের নেতিবাচক মতামতের কথা মন্ত্রণালয়ের একটি সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হলেও জেলা প্রশাসন বলছে, তারা এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন পাঠায়নি। ফলে দেশের একমাত্র বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্রহ্মপুত্রের বালুতে মূল্যবান খনিজের ভাণ্ডার
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) দীর্ঘদিনের গবেষণায় দেখা গেছে, হিমালয় অববাহিকা থেকে কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীতে প্রতিবছর প্রায় এক বিলিয়ন টন নবায়নযোগ্য বালু আসে। এই বালুতে রয়েছে গারনেট, কোয়ার্টজ, ম্যাগনেটাইট, জিরকন, ইলমেনাইট ও রুটাইলের মতো মূল্যবান খনিজ।
এসব খনিজের বিভিন্ন শিল্পে ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ইলমেনাইট ও রুটাইল টাইটানিয়াম উৎপাদনের প্রধান উৎস। রং, ওষুধ, প্লাস্টিক ও ওয়েল্ডিং রড তৈরিতে টাইটানিয়াম ব্যবহৃত হয়। জিরকন ব্যবহৃত হয় সিরামিক শিল্প, পারমাণবিক প্রযুক্তি, মহাকাশযান ও উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিকস খাতে। অন্যদিকে, ম্যাগনেটাইট ইস্পাত কারখানা ও খনিশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। গারনেট ও কোয়ার্টজ ব্যবহার করা হয় অলংকার, ওয়াটার জেট কাটিং, কম্পিউটার মাইক্রোচিপ, ঘড়ি ও চিকিৎসা যন্ত্রাংশ তৈরিতে।
৫০ বছরের মহাপরিকল্পনা
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১১ জুন জিএসবির মোখলেসুর রহমান মিলনায়তনে প্রকল্পটি নিয়ে একটি নীতিনির্ধারণী মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ২০২৬ থেকে ২০৭৫ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। পরিকল্পনার লক্ষ্য, যমুনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার খনিজ সম্পদ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম খনিজ-প্রযুক্তি ও শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ১৫ একর জমিতে একটি পাইলট রিসার্চ প্ল্যান্ট এবং রাজারহাট উপজেলার টগরাইহাট এলাকায় ১০ একর জমিতে মূল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়। এ কেন্দ্রের নাম দেওয়া হয়েছে ‘মিনারেল স্যান্ডস রিসার্চ হাব’। এতে বিরল মৃত্তিকা উপাদান বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন, স্কাডা, স্মার্ট মাইনিং এবং জিওলজিক্যাল বিগ ডাটা সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রকল্পের জন্য জমি জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নথিতে জেলা প্রশাসনের নেতিবাচক মতামত
প্রকল্পটির অগ্রগতির মধ্যে গত ১৯ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক অভ্যন্তরীণ সমন্বয় সভায় নতুন জটিলতা দেখা দেয়। সভার কার্যবিবরণীর ১০ নম্বর আলোচ্যসূচিতে উল্লেখ করা হয়, কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় সরকারের প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য হবে না বলে মত দেওয়া হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে এমন কোনো নেতিবাচক বা প্রকল্পবিরোধী প্রতিবেদন পাঠানো হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ৫ মার্চ কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী ও রাজারহাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক তথ্য-উপাত্ত ও নকশা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছিলেন। ফলে মন্ত্রণালয়ের নথিতে জেলা প্রশাসনের নামে নেতিবাচক মতামত কীভাবে যুক্ত হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্য
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, তাঁর যোগদানের আগে সাবেক জেলা প্রশাসকদের সময়ে বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য জমির সব তথ্য কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে গত ১৯ জুলাইয়ের সভায় জেলা প্রশাসনের নামে যে নেতিবাচক মতামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন তাঁদের দপ্তর থেকে পাঠানো হয়নি।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জেলাবাসীর আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কুড়িগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বালুতে মূল্যবান ও বিরল খনিজ রয়েছে। প্রকল্পের জন্য জমির সম্ভাব্যতা ও কার্যকারিতা যাচাই করে তাঁরা অনেক আগেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন।
জিএসবির উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) ড. সোহেল রানা বলেন, হিমালয় থেকে আসা ব্রহ্মপুত্রের বালু নবায়নযোগ্য। এ বালু থেকে রুটাইল, জিরকন ও কোয়ার্টজের মতো হালকা ও ভারী খনিজ আলাদা করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি দেশে টাইটানিয়াম ও জিরকোনিয়ামভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে স্থানীয়দের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান
জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগেই মন্ত্রণালয় কীভাবে লাভ-ক্ষতির বিষয়ে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাল, তা বোধগম্য নয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কুড়িগ্রামের দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
কুড়িগ্রাম হিতৈষী সংঘের সভাপতি এ কে এম সামিউল হক নান্টু বলেন, জেলার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রকল্প প্রয়োজন। স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে বালু গবেষণা কেন্দ্রটি বাস্তবায়ন জরুরি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটাতে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা থাকা এ প্রকল্পের বিষয়ে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এক হতে হবে। দ্রুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি। শিক্ষক নেতা অধ্যাপক হাসিবুর রহমান হাসিব বলেন, কুড়িগ্রামের মঙ্গা ও বেকারত্বের সমস্যা সমাধানে সরকার দ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে বলে তাঁরা প্রত্যাশা করেন।
জটিলতা নিরসনের আশ্বাস মন্ত্রীর
মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা তথ্যের বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে থাকলে তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে তা দ্রুত নিরসনের ব্যবস্থা নেবেন।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অপেক্ষায় কুড়িগ্রাম
ভারতের সীমান্তঘেঁষা কুড়িগ্রাম জেলার ওপর দিয়ে ১৬টি নদী প্রবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র আন্তর্জাতিক নদী। বন্যা, খরা, শীত ও নদীভাঙন এ জেলার মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন কুড়িগ্রামে।
এ অবস্থায় ব্রহ্মপুত্রের বালুতে থাকা খনিজ সম্পদ কাজে লাগানোর পরিকল্পনাকে জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রত্যাশা, মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে তথ্যগত অসংগতি দূর করে দ্রুত প্রকল্পের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এতে গবেষণা, খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
