Kaler Alo
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬
১৮ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

রাজশাহী সংবাদদাতা,কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ১১:৫৪ এএম

আদালতের আদেশে পদ্মায় বালু উত্তোলন, বিপাকে প্রশাসন

রাজশাহী সংবাদদাতা,কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ১১:৫৪ এএম

আদালতের আদেশে পদ্মায় বালু উত্তোলন, বিপাকে প্রশাসন

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মা নদীর ছয় মৌজার বালুমহাল স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। তবে ইজারা বন্ধ হলেও নদী থেকে বালু উত্তোলন ও নদীতীরের উর্বর পলিমাটি কাটা থামেনি। সাবেক ইজারাদারের বিরুদ্ধে ভেকু ও এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি কেটে নেওয়া এবং ড্রেজার দিয়ে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এতে সুলতানগঞ্জ আন্তর্জাতিক নৌবন্দরের নিরাপত্তা ও নদীতীরবর্তী এলাকার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন কয়েকটি পয়েন্ট থেকে লাখ লাখ ঘনফুট বালু এবং শতাধিক ট্রাক মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অথচ চলতি বছর জেলা প্রশাসন বালুমহালটির ইজারা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। আদালতের আদেশের ভিত্তিতে সাবেক ইজারাদার কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলে দাবি করলেও এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে বিআইডব্লিউটিএর বিলম্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আন্তর্জাতিক নৌবন্দরের সীমানায় বালু উত্তোলনের ঝুঁকি
 গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জে পদ্মা ও মহানন্দা নদীর মোহনায় রয়েছে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আন্তর্জাতিক নদীবন্দর বা নৌপ্রটোকল। কয়েক বছর আগে এ বন্দরের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ময়া নৌবন্দরের নৌযোগাযোগ স্থাপিত হয়। ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সুলতানগঞ্জ-ময়া নৌপথে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য শুরু হয়।

নৌবন্দরটির আশপাশের উজান ও ভাটির ২০ কিলোমিটার নদী এলাকা বন্দরের সীমানা হিসেবে গেজেটভুক্ত। এই সীমানা সংরক্ষণের দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএর। বন্দরসংলগ্ন নদী এলাকা থেকে বালু উত্তোলনকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে নৌপরিবহণ ও ভূমি মন্ত্রণালয়সহ রাজশাহী জেলা প্রশাসনকে বালুমহালের ইজারা কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল সংস্থাটি। এরপর চলতি বছর গোদাগাড়ীর পদ্মার ছয় মৌজার বালুমহালের ইজারা বন্ধ করে দেয় রাজশাহী জেলা মাটি ও বালু ব্যবস্থাপনা কমিটি। বালুমহালটি স্থায়ীভাবে বন্ধের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।

বন্ধ বালুমহালে সাবেক ইজারাদারের বালু উত্তোলন
রোববার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, বন্ধ ঘোষিত বালুমহালটির সাবেক ইজারাদার মাম এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুল মান্নাফ বালু উত্তোলন বন্ধ করেননি। বরং বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর থেকে নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ভেকু দিয়ে উর্বর পলিমাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পদ্মার সুলতানগঞ্জ থেকে ফুলতলা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার নদী এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, ফুলতলা থেকে উজানে রেলবাজার পর্যন্ত নদীতীরবর্তী এলাকায় বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর নতুন উর্বর পলিমাটি জমেছে। এসব জমির মালিক নদীপাড়ের বাসিন্দারা। তাঁরা কয়েক বছর ধরে বালুমহালটি বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। নতুন পলিমাটিতে ফসল ফলানোর পরিকল্পনা থাকলেও গত দুই মাস ধরে সাবেক ইজারাদার এসব মাটি কেটে নিচ্ছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ফুলতলাসহ চার-পাঁচটি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন কয়েক লাখ ঘনফুট বালু এবং শতাধিক ট্রাক মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ভেকু, এক্সকেভেটর ও ড্রেজার দিয়ে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা এ কার্যক্রম চললেও তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

আদালতের আদেশে কার্যক্রম চালানোর দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা প্রশাসন বালুমহালটি বন্ধ ঘোষণা করে চলতি বছর ইজারা না দিলেও সাবেক ইজারাদার আদালতের আদেশের কথা বলে বালু উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের ধারণা, ইজারার শর্তসংক্রান্ত তথ্য গোপন করে আদালত থেকে আদেশ নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সাবেক ইজারাদারের বক্তব্য ভিন্ন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাম এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুল মান্নাফ গত জুলাই মাসে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে হাইকোর্টে একটি রিট করেন। গত ৬ আগস্ট হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ তাঁকে পরবর্তী তিন মাসের জন্য বালুমহালের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেন। ওই আদেশের সময়সীমা আগামী ৬ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা। তবে সাবেক ইজারাদার আগের আদেশের মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইজারার মেয়াদ শেষ, অধিকার নেই: জেলা প্রশাসন
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সাবেক ইজারাদারের পক্ষে বালু উত্তোলনের আদেশের কপি পাওয়ার পর রাজশাহী জেলা মাটি ও বালু ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম গত ৭ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহণ ও ভূমি মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সলিসিটরসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে জরুরি চিঠি পাঠান।

চিঠিতে জেলা প্রশাসক উল্লেখ করেন, ইজারা চুক্তি অনুযায়ী সাবেক ইজারাদার ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল বা ১৪৩৩ বাংলা সনের ৩০ চৈত্র পর্যন্ত বালুমহালটি ভোগদখল করেছেন। চুক্তির বিভিন্ন শর্ত অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বালুমহালের ওপর তাঁর আর কোনো অধিকার বহাল থাকে না। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে দ্রুত আপিল করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধও জানান তিনি।

রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, হাইকোর্টের প্রথম আদেশ পাওয়ার পরপরই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটরসহ বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আপিল করতে কেন বিলম্ব করছে, তা তাঁদের জানা নেই। তিনি আরও বলেন, জেলা মাটি ও বালু ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তে বালুমহালটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। বর্তমানে এর ওপর জেলা প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এর কাস্টোডিয়ান বিআইডব্লিউটিএ।

আপিল নিয়ে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ
জেলা প্রশাসনের চিঠি পাওয়ার পর বিআইডব্লিউটিএ হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে রাজশাহীর একজন নেতার হস্তক্ষেপে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই নেতা গত মাসের শেষ দিকে বিআইডব্লিউটিএর সদর দপ্তরে গিয়ে কর্মকর্তাদের আপিল না করার জন্য চাপ দেন। পরে সংস্থাটির পক্ষ থেকে আপিল দাখিলে বিলম্ব হওয়ায় সাবেক ইজারাদার একতরফা শুনানির মাধ্যমে বালু উত্তোলন অব্যাহত রাখার দ্বিতীয় আদেশ পান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল দাখিলে বিলম্বের বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর সদস্য ও যুগ্ম সচিব (পরিকল্পনা ও অপারেশন) মো. সাজেদুর রহমান রোববার দুপুরে বলেন, আপিল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তা দাখিল করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে।

দ্রুত বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি স্থানীয়দের
পদ্মার ছয় মৌজা বালুমহাল এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, গত বছরও ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সাবেক ইজারাদার আরও তিন মাস অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন করেছিলেন।

এলাকাবাসীর দাবি, নদীতীরের উর্বর পলিমাটি রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক নৌবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে বালু ও মাটি উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি নদীতীরবর্তী এলাকায় নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। অন্যদিকে সাবেক ইজারাদার মাম এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুল মান্নাফ বলেন, তিনি আদালতের আদেশ নিয়েই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। হাইকোর্ট তাঁকে বালু উত্তোলন ও পরিবহণসহ সব কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

Link copied!