Kaler Alo
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬
২০ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমানের চীন সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

মাদারীপুর সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ১০:৫৮ এএম

দখল আর পলিতে অস্তিত্ব সংকটে শিবচরের নদী

মাদারীপুর সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ১০:৫৮ এএম

দখল আর পলিতে অস্তিত্ব সংকটে শিবচরের নদী

একসময় যে নদীর বুক চিরে ছুটে চলত লঞ্চ, ট্রলার ও পণ্যবাহী নৌযান, সেই নদীর বুকে এখন জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চর। কোথাও নদীর মাঝেই হচ্ছে ফসলের আবাদ, কোথাও আবার বন্ধ হওয়ার পথে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। দীর্ঘদিন খনন না হওয়া, পলি জমে নাব্যতা সংকট, অপরিকল্পিত ভরাট ও নদীর তীর দখলের অভিযোগে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার একসময়ের খরস্রোতা নদ-নদীগুলো।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীর প্রবাহপথ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বর্ষায় কিছু অংশ পানিতে ভরে উঠলেও শুকনো মৌসুমে নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা পরিণত হচ্ছে শুকনো চর ও ফসলি জমিতে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ। পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে নৌযোগাযোগ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় সরকারি নথিপত্রে নদ-নদীর সংখ্যা ১৭টি। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত পদ্মা, পালরদী, ময়নাকাটাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর মধ্যে বর্তমানে দৃশ্যমান রয়েছে মাত্র ১০টি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় জেলার বেশ কয়েকটি নদী নাব্যতা হারিয়েছে। পরিবর্তন এসেছে কোনো কোনো নদীর গতিপথেও। শিবচরের শিরুয়াইল, নিলখী, বাঁশকান্দি, পৌর এলাকা, পাচ্চর ও দ্বিতীয়াখণ্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় নদ-নদীর এমন চিত্র দেখা গেছে। একসময়ের প্রবহমান নদীগুলোর অনেক অংশ পলি ও কাদায় ভরাট হয়ে সংকুচিত হয়েছে। কোথাও কোথাও নদীর অস্তিত্বই বিলীন হওয়ার পথে।

আড়িয়াল খাঁর শাখা নদীতে ফসলের আবাদ
শিবচরের শিরুয়াইল থেকে নিলখী হয়ে প্রবাহিত আড়িয়াল খাঁ নদের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে ‘মরা আড়িয়াল খাঁ’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন পলি জমে ভরাট হওয়ায় নদীটির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বর্ষায় কোথাও কোথাও পানি জমলেও শুকনো মৌসুমে নদীর বিস্তীর্ণ অংশ শুকিয়ে যায়। এমনকি নদীর বুকেই এখন চলছে ফসলের আবাদ।

দত্তপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাসুম মিয়া বলেন, ‘আমাদের উৎরাইল বাজারের পাশের নদীটি এখন আর নদী নাই! এটা আড়িয়াল খাঁ নদেরই একটি অংশ। একসময় এটাই বড় নদী ছিল। এখন এর কোনো গতিপথই নেই। নদীর মাঝে বর্ষা মৌসুমে পানি জমে। শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে যায়। নদীর মধ্যে এখন ফসল ফলানো হয়।’ স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত খনন ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া না হলে গুরুত্বপূর্ণ এই নদীপথের অবশিষ্ট অংশটুকুও একসময় হারিয়ে যাবে।

ময়নাকাটা নদীতেও দখল-ভরাটের অভিযোগ
শিবচর পৌর এলাকার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ময়নাকাটা নদীও এখন অস্তিত্ব সংকটে। একসময় বর্ষা মৌসুমে এই নদী দিয়ে চলাচল করত পণ্যবাহী নৌযান। বর্তমানে পলি ও কাদা জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও পানিপ্রবাহের পথ সংকুচিত হয়েছে। শুকনো মৌসুমে নদীর বুকে জেগে উঠছে চর। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে নদীর তীর ও চরাঞ্চলের জায়গা ভরাট করে দখল করা হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও নদীর বিভিন্ন অংশ ভরাট ও দখলের অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

এ ছাড়া শিবচর পৌরসভার ‘ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী দাদাভাই শিবচর উপশহর’ নদীর চরাঞ্চলে গড়ে উঠেছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। উপশহর নির্মাণের ফলে নদীর চরাঞ্চলের কিছু এলাকা দখল বা ভরাট হয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি দাবি করেছেন।

বিলপদ্মা নদীতে একসময় চলত লঞ্চ-ট্রলার
শিবচরের বাঁশকান্দি ইউনিয়নের বিলপদ্মা নদীর অবস্থাও আশঙ্কাজনক। দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় নদীর দুই তীরে পলি জমে চর জেগেছে। ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে নদীর প্রবাহপথ। অথচ একসময় এই নদী দিয়ে বড় বড় লঞ্চ ও ট্রলার চলাচল করত।

বাঁশকান্দি ইউনিয়নের শুম্ভুক গ্রামের বাসিন্দা আসাদ মিয়া বলেন, ‘আমাদের বাড়ির কাছে বিলপদ্মা নদী। কালের বিবর্তনে এখন অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। এই নদী দিয়ে বড় বড় লঞ্চ চলছে, ট্রলার চলছে। এখন চর পড়ে শুকিয়ে গেছে।’ স্থানীয়দের মতে, বিলপদ্মা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পরিকল্পিত খনন জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে নদীটির নৌপথ হিসেবে ব্যবহার আরও সীমিত হয়ে পড়বে।

পদ্মা-সংলগ্ন এলাকাতেও জেগে উঠছে চর
পদ্মার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত শিবচরের দ্বিতীয়াখণ্ড ও কুতুবপুর এলাকাতেও পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া নদী এবং নদীর পুরোনো প্রবাহপথ রয়েছে। দীর্ঘদিন পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া ও পলি জমার কারণে এসব নদীর অনেক অংশ সংকুচিত হয়েছে।

অন্যদিকে পদ্মা-সংলগ্ন মাদবরেরচরসহ পদ্মা নদীর বিভিন্ন অংশে শুকনো মৌসুমে জেগে উঠছে চর। পদ্মা সেতুর আশপাশেও দেখা যাচ্ছে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। তবে নদীতে চর জাগা প্রাকৃতিক পলি সঞ্চয়ের অংশ। নদীর প্রবাহ, নাব্যতা ও তীরবর্তী এলাকার পরিবর্তনের প্রকৃত চিত্র জানতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিকল্পিত শিবচরের জন্য নদী রক্ষার দাবি
শিবচরের বিশিষ্ট সমাজসেবক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বাবুল গোমস্তা বলেন, ‘আমরা পরিকল্পিত শিবচর চাই। ময়নাকাটা নদীকে আমাদের অস্তিত্বের জন্য রক্ষা করতে হবে। ময়নাকাটা নদীকে রক্ষা করতে পারলে পরিকল্পিত শিবচর গড়ে তোলা সম্ভব।’

স্থানীয়দের মতে, নদ-নদী শুধু পানি প্রবাহের মাধ্যম নয়; এগুলো এলাকার কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌযোগাযোগ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নদী ভরাট হয়ে গেলে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনে বিঘ্ন ঘটতে পারে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে জলজ পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা।

নদী রক্ষায় পরিকল্পনার কথা জানাল প্রশাসন
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, শিবচরের নদীগুলো রক্ষার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করতে চাচ্ছে উপজেলা প্রশাসন। তবে বিআরএস নকশা ও পর্চা অনুযায়ী নদীগুলোর সঠিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। উপজেলার প্রতিটি নদী ও খালের প্রকৃত চিত্র বের করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ সাপেক্ষে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবু সাদত মো. হাসান কবির বলেন, শিবচর উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা নদী ময়নাকাটা নদীর অনেক স্থানেই দখল ও নাব্যতা সংকটে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার পথে। তবে এই মুহূর্তে ময়নাকাটা নদী খনন ও পুনরুদ্ধারের কোনো কার্যক্রম তাঁদের হাতে নেই। ভবিষ্যতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নদীটি উদ্ধার ও খননের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

স্থানীয়দের দাবি, শিবচরের নদ-নদীগুলো রক্ষায় প্রথমেই নদীর প্রকৃত সীমানা ও পুরোনো প্রবাহপথ চিহ্নিত করতে হবে। এ জন্য বিআরএসসহ প্রাসঙ্গিক ভূমি রেকর্ড, ঐতিহাসিক মানচিত্র ও সরেজমিন জরিপের মাধ্যমে নদীর সঠিক অবস্থান নির্ধারণ জরুরি। এরপর অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নতুন করে ভরাট বন্ধ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার অনুযায়ী খননের উদ্যোগ নিতে হবে। একসময় যে নদীগুলো ছিল শিবচরের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও যোগাযোগের অন্যতম প্রধান অবলম্বন, সেগুলো আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এসব নদী হয়তো কেবল মানচিত্র আর স্মৃতির অংশ হয়েই থাকবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

Link copied!