সন্তানের বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপেই বাবা-মায়ের বাড়তি মনোযোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক ও আচরণগত নানা বদল দেখা দেয়। এ সময় সন্তান কখনো নিজের মতো থাকতে চায়, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে বেশি সময় কাটায়, আবার কখনো ছোট বিষয়েও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে।
কৈশোরে পড়াশোনার চাপ, বন্ধুমহলের প্রভাব, পারিবারিক অস্থিরতা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ ভুল সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। মাদক বা অন্য কোনো নেশায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে সন্তানের আচরণ, দৈনন্দিন অভ্যাস ও শারীরিক অবস্থার দিকে নজর রাখা জরুরি।
তবে মনে রাখতে হবে, কোনো একটি লক্ষণ দেখেই সন্তান মাদকাসক্ত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একই ধরনের পরিবর্তনের পেছনে শারীরিক বা মানসিক অন্য কারণও থাকতে পারে। তাই প্রয়োজন সচেতন পর্যবেক্ষণ, সহমর্মিতা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ।
আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন
সন্তান আগে যে কাজগুলো করতে পছন্দ করত, সেগুলোর প্রতি হঠাৎ আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের এড়িয়ে চলা কিংবা দীর্ঘ সময় একা থাকার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
মেজাজের অস্বাভাবিক পরিবর্তনও খেয়াল করা জরুরি। সামান্য কারণে রেগে যাওয়া, খিটখিটে আচরণ করা, চিৎকার করা কিংবা অকারণে মন খারাপ করে থাকা—এসব পরিবর্তন নিয়মিত দেখা গেলে সন্তানের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।
পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, পরীক্ষার ফল হঠাৎ খারাপ হওয়া, স্কুল বা কলেজে অনুপস্থিতি এবং দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনে অনীহাও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। আগে নিয়মিত পড়াশোনা করা সন্তান হঠাৎ সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে তার পেছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করুন।
অতিরিক্ত গোপনীয়তা ও অর্থ চাওয়ার প্রবণতা
কৈশোরে ব্যক্তিগত পরিসর চাওয়া স্বাভাবিক। তবে আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে অতিরিক্ত গোপনীয়তা দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক সতর্কতা, নিজের অবস্থান বা কাজ সম্পর্কে বারবার অসংগত তথ্য দেওয়া কিংবা ঘন ঘন অতিরিক্ত হাতখরচ চাওয়ার প্রবণতা কিছু ক্ষেত্রে সতর্কতার সংকেত হতে পারে।
কখনো আচরণ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। সামান্য বিষয় নিয়ে চিৎকার, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিরোধ, জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলা কিংবা ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটলে শুধু শাস্তি দেওয়ার কথা না ভেবে আচরণের পেছনের কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।
শারীরিক পরিবর্তনেও নজর দিন
নেশাজাতীয় পদার্থের প্রভাব আচরণের পাশাপাশি শারীরিক অবস্থাতেও পড়তে পারে। ঘুমের স্বাভাবিক রুটিন বদলে যাওয়া, সারা রাত জেগে থাকা কিংবা অস্বাভাবিক বেশি ঘুমানোর প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
খাবারের প্রতি অনীহা, দুর্বলতা এবং অল্প সময়ে ওজন অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও খেয়াল করা প্রয়োজন। চোখ লাল হয়ে থাকা, চোখের চারপাশ ফুলে থাকা কিংবা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি উদাসীনতাও কিছু ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে।
কথাবার্তা অসংলগ্ন হয়ে যাওয়া, চিন্তা গুছিয়ে প্রকাশ করতে অসুবিধা কিংবা স্বাভাবিক কথোপকথনে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারার মতো পরিবর্তনও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
এসব লক্ষণ থাকলেই মাদক গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত হয় না। তাই অনুমানের ভিত্তিতে সন্তানকে দোষারোপ না করে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা করাই ভালো।
বকাঝকা নয়, সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন
সন্তানের আচরণে উদ্বেগজনক পরিবর্তন দেখা দিলে অভিভাবকদের প্রথম কাজ হলো শান্ত থাকা। রাগ, ভয় কিংবা হতাশা থেকে বকাঝকা, অপমান বা শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সন্তান যখন শান্ত ও স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে, তখন তার সঙ্গে একান্তে কথা বলুন। অভিযোগ বা জেরা করার পরিবর্তে ভালোবাসা ও উদ্বেগের জায়গা থেকে নিজের কথা তুলে ধরুন। তাকে বোঝান, তার আচরণ ও জীবনযাপনের পরিবর্তন আপনার চোখে পড়েছে এবং আপনি তাকে সহযোগিতা করতে চান।
কথোপকথনের সময় সন্তানের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তার জীবনে কোনো মানসিক চাপ, সম্পর্কের জটিলতা, বন্ধুমহলের প্রভাব কিংবা পারিবারিক অস্থিরতা কাজ করছে কি না, তা জানার চেষ্টা করুন। নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ পেলে সন্তানও সমস্যার কথা বলতে স্বস্তি পেতে পারে।
প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন
শুধু পারিবারিক বোঝাপড়া দিয়ে সব ধরনের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। সন্তান নেশাজাতীয় কোনো পদার্থ গ্রহণ করছে বলে সন্দেহ হলে, কিংবা আচরণ ও শারীরিক পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা আসক্তি চিকিৎসায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নের ভিত্তিতে কাউন্সেলিং, চিকিৎসা কিংবা পুনর্বাসনের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবারের ইতিবাচক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে ভয় দেখানো বা একঘরে করে দেওয়ার পরিবর্তে তার পাশে থাকা এবং চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করা জরুরি।
সচেতনতা মানে সন্দেহ নয়, পাশে থাকা
কৈশোরের পরিবর্তন সব সময় সমস্যার ইঙ্গিত দেয় না। তবে সন্তানের স্বাভাবিক আচরণে বড় ধরনের ও দীর্ঘস্থায়ী বদল দেখা গেলে তা উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। অভিভাবকেরা সন্তানের দৈনন্দিন অভ্যাসের দিকে নজর রাখার পাশাপাশি তার সঙ্গে বিশ্বাস ও যোগাযোগের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন।
সন্তানকে সুস্থ ও নিরাপদ জীবনে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন ভালোবাসা, ধৈর্য, সহযোগিতা এবং সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা। সতর্কতা মানে সন্দেহের চোখে দেখা নয়; বরং সন্তানের পরিবর্তন বুঝে তার পাশে দাঁড়ানো।
