কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর কৃষিজমি। বছরের সাত থেকে আট মাস এসব জমি পানির নিচে থাকে। ফলে তিন ফসলি জমিতে বছরে মাত্র একবার বোরো ধানের আবাদ করতে পারছেন কৃষকেরা। এতে কমছে খাদ্যশস্য উৎপাদন, বাড়ছে চাষাবাদের খরচ এবং লোকসানের মুখে পড়ছেন কৃষকেরা।
কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের হিসাবে, জলাবদ্ধ এসব জমিতে বছরে বোরো মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার ২২৫ টন ধান উৎপাদিত হয়। অথচ পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে আমন ও আউশ মৌসুমেও চাষাবাদ সম্ভব হতো। এতে অতিরিক্ত ১০ হাজার টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, পদ্মা, গড়াই, কালীগঙ্গা ও ডাকুয়া—চার নদীবেষ্টিত এই উপজেলায় ছোট-বড় অসংখ্য জিকে সেচ খাল থাকলেও পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন নালার অভাব রয়েছে। যেসব খাল রয়েছে, সেগুলোর বেশ কয়েকটি দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বছরের অধিকাংশ সময় জমিতে পানি জমে থাকছে।
বিলজুড়ে পানি, আগাছায় ঢেকেছে জমি
মঙ্গলবার সকালে উপজেলার বহলবাড়ীয়া, চাঁদপুর, বাঁশআড়া, বাঁখই, করাতকান্দি ও জগন্নাথপুর বিল ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পানিতে ডুবে আছে। কোথাও কচুরিপানা, কোথাও কলমি, শাপলা ও বিভিন্ন ধরনের আগাছায় ছেয়ে গেছে জমি। কোনো কোনো স্থানে ডিঙি নৌকায় মাছ ধরছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কয়েকজন কৃষক চলতি মৌসুমে চাষাবাদের প্রস্তুতি নিতে আগাছা পরিষ্কার করছেন।
তবে জলাবদ্ধতার কারণে চাষাবাদের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকে কৃষিকাজ ছেড়ে পুকুর খনন করে মাছ চাষের দিকে ঝুঁকেছেন। বিলসংলগ্ন এলাকার খালগুলোর বিভিন্ন অংশে পুকুর খনন, বসতবাড়ি ও রাস্তা নির্মাণের চিত্রও দেখা গেছে। সংস্কারের অভাবে অনেক খাল দিয়ে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে রয়েছে।
নন্দলালপুর ইউনিয়নের বহলবাড়ীয়া বিলের কৃষক রবিউল ইসলামের ১৬ বিঘা জমি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘১০-১২ বছর আগেও খাল দিয়ে পানি গড়াই নদীতে চলে যেত। তখন বছরে তিনবার ধান হতো। এখন পানি বের হতে পারে না। কোনো রকমে একবার ফসল ফলাই। বাপ-দাদার জমি পড়ে থাকে, তাই কষ্ট করে চাষ করি।’
একই বিলের কৃষক মাজেদ আলী বলেন, ‘চারদিকে নদী, তারপরও পানি বের হওয়ার পথ নেই। কচুরিপানা ও আগাছা পরিষ্কার করতে বিঘাপ্রতি ছয়জন শ্রমিক লাগে। খরচ বেশি, কিন্তু উৎপাদন ও লাভ কম।’
গোবিন্দপুর বিলের কৃষক আব্দুস সামাদ বলেন, ‘জমিতে পানি জমে থাকে। বছরে একবারের বেশি ফসল ফলানো যায় না। পরিকল্পিতভাবে খাল খনন ও সংস্কার করা হলে এসব জমিতে বছরে তিনবার ফসল ফলানো সম্ভব।’
সদকী ইউনিয়নের করাতকান্দি বিলের ষাটোর্ধ্ব কৃষক আজাহার বিশ্বাস বলেন, ‘একবার চাষ করে বিঘাপ্রতি ১২ থেকে ১৪ মণ ধান পাওয়া যায়। সেই ধান বিক্রি করে যা আয় হয়, আগাছা পরিষ্কার ও চাষের খরচ দিতেই তা শেষ হয়ে যায়।’
তিন বছরে জলাবদ্ধ জমি বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুমারখালী উপজেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত। সাতটি ইউনিয়নে জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ নন্দলালপুরে ২৯০, সদকীতে ২৫০, জগন্নাথপুরে ২৪০, শিলাইদহে ২০৫, যদুবয়রায় ৭৫, কয়ায় ১২০ এবং চাপড়ায় ৭০ হেক্টর।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ ছিল ৫১০ হেক্টর। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৯০ হেক্টরে। চলতি বছরে জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ আরও বেড়ে প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টরে পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়া এবং পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর জলাবদ্ধতার বিস্তৃতি বাড়ছে। খালগুলো নিয়মিত সংস্কার না হওয়া এবং পানি প্রবাহের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
৩৫ কোটি টাকার খাদ্যশস্য উৎপাদনের সম্ভাবনা
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন বলেন, উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমি জলাবদ্ধ। এসব জমিতে শুধু বোরো মৌসুমে ৬ হাজার ২২৫ টন ধান উৎপাদিত হয়। জলাবদ্ধতা দূর করা গেলে আমন ও আউশ মৌসুমেও চাষাবাদ সম্ভব হতো। এতে অতিরিক্ত ১০ হাজার টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করা যেত, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।
তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
খাল খননের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাইসুল ইসলাম বলেন, দুটি খালের বিষয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। খনন প্রকল্প শুরু হলে জলাবদ্ধতা কিছুটা নিরসন হবে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষি বিভাগ, কৃষক, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কুমারখালীর কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় একদিকে যেমন ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকেরা হারাচ্ছেন বছরে একাধিকবার চাষাবাদের সুযোগ। খাল খনন ও সংস্কারের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে বিপুল পরিমাণ জমি আবারও তিন ফসলি আবাদে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
