সামনে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়, পেছনে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়। দূরত্ব মাত্র ১৫০ ও ২০ গজ। কাছেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও উপজেলা পরিষদ। অথচ এসব সরকারি দপ্তরের মাঝখানেই জরাজীর্ণ ভবনে চলছে ১০২ শিশুর পাঠদান। দেয়ালে বড় বড় ফাটল, খসে পড়ছে পলেস্তারা, বৃষ্টিতে ছাদ চুইয়ে শ্রেণিকক্ষে পড়ে পানি। এমন পরিবেশে প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে ক্লাস করছে জয়পুরহাট নার্সারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যালয়টির ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯৮০ সালে। দীর্ঘ ৪৬ বছরেও নতুন ভবন নির্মাণ হয়নি। ২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হলেও এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা। তবে এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
তিনটি কক্ষে চলছে সব শ্রেণির পাঠদান
সম্প্রতি সরেজমিনে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচ কক্ষের একতলা ভবনের একটি কক্ষে তালা ঝুলছে। সেখানে কোনো পাঠদান হয় না। আরেকটি কক্ষ ব্যবহার করা হচ্ছে শিক্ষকদের দাপ্তরিক কাজের জন্য। ফলে বাকি তিনটি কক্ষেই বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে হচ্ছে।
ভবনের বিভিন্ন অংশের দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা গেছে। কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে ইট বেরিয়ে এসেছে। বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে শ্রেণিকক্ষে। এতে পাঠদানের পরিবেশ যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য রয়েছে মাত্র একটি ওয়াশরুম। পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সত্ত্বেও শ্রেণিকক্ষের সংকট এবং আধুনিক স্যানিটেশন সুবিধার অভাবে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সবাইকে।
জাতীয়করণের এক যুগেও হয়নি নতুন ভবন
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮০ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় বর্তমান ভবন নির্মাণ করা হয়। ২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে ৮৩ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে ছয়জন শিক্ষক ও ১০২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
বিদ্যালয়ের জমির পরিমাণ পর্যাপ্ত হলেও শ্রেণিকক্ষের সংকট কাটেনি। দীর্ঘদিন ধরে ভবনটির অবস্থা খারাপ হতে থাকলেও নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামীম ইকবাল বলেন, বিদ্যালয়টির ভবন অনেক পুরোনো। দেয়ালে ফাটলও ধরেছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য অনেক আগেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জেছের আলী বলেন, জেলার প্রশাসনিক চত্বরে অবস্থিত নার্সারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের অবস্থা ভালো নয়। নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
ফাটল ধরা দেয়ালে ক্লাস করতে ভয় পায় শিশুরা
বিদ্যালয়ের তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী জানায়, শ্রেণিকক্ষের দেয়ালে ফাটল থাকায় সেখানে বসে তাদের ভয় হয়। ভবনের কোনো অংশ হঠাৎ ভেঙে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করে তারা।
অভিভাবক ইমতিয়াজ আহমেদ ও শিউলি খাতুন বলেন, দেয়ালে ফাটল ও পলেস্তারা খসে পড়া ভবনে সন্তানদের পাঠিয়ে তাঁরা সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকেন। কখন ভবনের কোনো অংশ ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে, সেই ভয় কাজ করে। তাঁরা বলেন, জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এমন অবস্থা মেনে নেওয়া কঠিন। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ করে শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে পাঠদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
ভবনের দুরবস্থায় কমছে শিক্ষার্থী
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লাইলা আকতার জাহান বলেন, ২০১৮ সালে বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার সময় থেকেই ভবনটির খারাপ অবস্থা দেখে আসছেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো হলেও এখনো নতুন ভবন নির্মাণ হয়নি।
তিনি জানান, ভবনের দুরবস্থার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তান ভর্তি করানোর পর অন্য বিদ্যালয়ে নিয়ে যান। বিদ্যালয় চলাকালে ভূমিকম্প হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
সহকারী শিক্ষক ইশরাত জাহান বলেন, বিদ্যালয়ের পরিবেশ ভালো না থাকায় দিন দিন শিক্ষার্থী কমছে। গ্রামের অনেক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করা হলেও জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে থাকা এই বিদ্যালয়ে নতুন ভবন হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, একটি মাত্র ওয়াশরুম শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবাইকে ব্যবহার করতে হয়। এতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যালয়ের সামনে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, পেছনে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এবং কাছেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থাকার পরও ভবনের এমন অবস্থা কাম্য নয়। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রত্যাশা, প্রস্তাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। এতে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের পাঠদানের পরিবেশও উন্নত হবে।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
