Kaler Alo
শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬
২১ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমানের চীন সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

রংপুর সংবাদদাতা , কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৬, ২০২৬, ১১:৩১ এএম

রংপুরে দেড় লাখ টন আলু নিয়ে বিপাকে কৃষক

রংপুর সংবাদদাতা , কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৬, ২০২৬, ১১:৩১ এএম

রংপুরে দেড় লাখ টন আলু নিয়ে বিপাকে কৃষক

রংপুরে আলুর বাজারে ধস নামায় চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও হিমাগারমালিকেরা। উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুতে কৃষকের ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৪ টাকা। অথচ হিমাগার থেকে বের করে সেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে সর্বোচ্চ ১২ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে অর্ধেকেরও বেশি লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় লোকসানের ভয়ে অনেক কৃষক হিমাগারে রাখা আলু উত্তোলন করছেন না।

রংপুর জেলার ৪২টি হিমাগারে এখনো প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন আলু মজুত রয়েছে। কৃষকেরা আলু উত্তোলন না করায় একদিকে যেমন সংরক্ষিত পণ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন, অন্যদিকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন হিমাগারমালিকেরাও।

ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি আলু সংরক্ষণ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রংপুরের ৪২টি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা চার লাখ ৭০ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন। তবে চলতি মৌসুমে এসব হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে চার লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ মেট্রিক টন। এর মধ্যে খাবার আলু তিন লাখ ২৪ হাজার ৯৪৮ মেট্রিক টন এবং বীজ আলু এক লাখ ৬৩ হাজার ৬৯০ মেট্রিক টন।

গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত হিমাগারগুলো থেকে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন খাবার আলু এবং ছয় হাজার মেট্রিক টন বীজ আলু উত্তোলন করা হয়েছে। গত জুন থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৫০ হাজার মেট্রিক টন খাবার আলু বের করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অনেক কমে যাওয়ায় বর্তমানে আলু উত্তোলনের গতি কমে এসেছে। অনেক কৃষক হিসাব করে দেখছেন, হিমাগার থেকে আলু বের করে বিক্রি করলে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা দিয়ে উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচের সামান্য অংশও পূরণ হবে না।

২৪ টাকার আলু বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকায়
কৃষকদের হিসাবে, এ বছর বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরিসহ আলু উৎপাদনে প্রতি কেজিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১৭ টাকা। এর সঙ্গে হিমাগার ভাড়া বাবদ যুক্ত হয়েছে প্রায় ৭ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুর পেছনে ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ টাকা।

অথচ বর্তমানে হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১২ টাকায়। খুচরা বাজারে অবশ্য এই আলু বিক্রি হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে। ফলে কৃষক যে দামে আলু বিক্রি করছেন, তার সঙ্গে উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচের বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে চলতি মাসের শেষ দিকে বাজারে নতুন আলু আসতে শুরু করবে। এতে সংরক্ষিত পুরোনো আলুর দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। তাই লোকসান কমাতে অনেকে হিমাগার থেকে আলু না তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ঋণ করে আলু রেখেও বিপাকে কৃষকেরা
গঙ্গাচড়ার চেংমারী এলাকার কৃষক শওকত আলী জানান, গত বছর আলু চাষ করে লোকসান গুনতে হয়েছিল তাঁকে। এবার ভালো দাম পাওয়ার আশায় ঋণ করে আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। কিন্তু বাজারের পরিস্থিতি বদলায়নি। বর্তমান দরে আলু উত্তোলন করে বিক্রি করলে গাড়িভাড়া ও হিমাগার ভাড়ার টাকাও উঠবে না। উল্টো নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে হবে। তাই হিমাগারে রাখা আলু পড়ে থাকার উপক্রম হয়েছে।

রংপুর নগরীর রঘুবাজার এলাকার কৃষক ভুপাল চন্দ্র রায়ও বর্তমানে হিমাগার থেকে আলু তোলা বন্ধ রেখেছেন। তাঁর হিসাবে, এখন আলু উত্তোলন করলে প্রতি কেজিতে কমপক্ষে ১২ টাকা লোকসান হবে।

তিনি জানান, নগরীর সবুজ বাংলা ও অপু মুন্সী হিমাগারে তাঁর মোট ৫০০ বস্তা আলু সংরক্ষিত রয়েছে। উৎপাদন খরচ, হিমাগার ভাড়া, বস্তায় প্যাকিং ও পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে প্রতি কেজিতে খরচ পড়েছে অন্তত ২৪ টাকা। অথচ হিমাগার গেটে বিক্রি করতে হচ্ছে ১২ টাকায়।

ভুপাল চন্দ্র রায় বলেন, শুধু তিনি নন, তাঁর এলাকার অনেক কৃষকই লোকসানের আশঙ্কায় হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন প্রায় বন্ধ রেখেছেন। গত বছরও শেষ পর্যন্ত তিনি হিমাগার থেকে আলু তোলেননি। এতে তাঁর প্রায় আট লাখ টাকা লোকসান হয়েছিল।

বাকি আলু তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক
মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দ বেলতলী এলাকার কৃষক হায়দার আলী জানান, কিছুদিন আগে তিনি হিমাগার থেকে ২৫০ বস্তা আলু তুলে বিক্রি করেছেন। তখন প্রতি কেজি আলুর দাম পেয়েছেন ১৫ টাকা। কিন্তু বর্তমানে দাম কমে ১২ টাকায় নেমে এসেছে। তাঁর অবশিষ্ট ৫০০ বস্তা আলু বিক্রি করে কত টাকা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। বড় অঙ্কের লোকসানের আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট আলু আর উত্তোলন করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই কৃষক।

কৃষক আলু না তোলায় বিপাকে হিমাগারমালিকেরা
কৃষকেরা আলু উত্তোলনে আগ্রহ না দেখানোয় হিমাগারমালিকেরাও সমস্যায় পড়েছেন। অনেক হিমাগার কর্তৃপক্ষ কৃষকদের আলু উত্তোলনের জন্য নোটিশ দিলেও তাঁরা সাড়া দিচ্ছেন না। এতে হিমাগারের সংরক্ষণ কার্যক্রম ও আর্থিক হিসাব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বদরগঞ্জের শাহজালাল হিমাগার এবং গঙ্গাচড়ার এমএনটি হিমাগারের ব্যবস্থাপক সুভাস মুখার্জি জানান, হিমাগার দুটির মোট ধারণক্ষমতা ২৪ হাজার মেট্রিক টন। সংরক্ষিত আলুর প্রায় ৫০ শতাংশ এখনো হিমাগারে পড়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলুর দাম সর্বোচ্চ ১২ টাকা হওয়ায় কৃষকেরা লোকসানের ভয়ে আলু তুলতে চাইছেন না। এতে কৃষকদের পাশাপাশি হিমাগারমালিকদেরও লোকসানে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেড় লাখ টন আলু এখনো হিমাগারে
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৪২টি হিমাগারে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করেন। কিন্তু উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে দাম অনেক কম হওয়ায় সংরক্ষণকারীদের মধ্যে আলু উত্তোলনে অনীহা দেখা দিয়েছে।

গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত হিমাগারগুলোতে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন আলু মজুত ছিল। নতুন আলু বাজারে আসার সময় ঘনিয়ে আসায় পুরোনো আলুর দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে কৃষকদের লোকসানের পাশাপাশি হিমাগারমালিকদের আর্থিক সংকটও বাড়তে পারে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

Link copied!