ব্রহ্মপুত্রের বুকে বয়ে আসা বালুর নিচে লুকিয়ে রয়েছে মূল্যবান খনিজ সম্পদের বিশাল সম্ভাবনা। এই বালু থেকে টাইটানিয়াম, জিরকন, ম্যাগনেটাইটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পৃথক করে দেশের শিল্প খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব। সঠিক প্রযুক্তি ও পরিকল্পনা কাজে লাগানো গেলে কমতে পারে আমদানিনির্ভরতা, গড়ে উঠতে পারে খনিজভিত্তিক শিল্প এবং সৃষ্টি হতে পারে বিপুল কর্মসংস্থান। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য, বন্যা ও নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করা কুড়িগ্রামের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কুড়িগ্রাম বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনায় ছিল আধুনিক গবেষণাগার, খনিজ পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের রূপরেখা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল।
তবে গবেষণা ও প্রাথমিক প্রস্তুতিতে অগ্রগতি থাকলেও প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। মাঠপর্যায়ের ইতিবাচক তথ্যের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সভার কার্যবিবরণীতে উঠে আসা নেতিবাচক বক্তব্যের অমিল নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। জেলা প্রশাসনের দাবি, প্রকল্পের বিপক্ষে তারা কোনো প্রতিবেদন পাঠায়নি। অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরও জমির সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে প্রতিবেদন পাঠানোর কথা জানিয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে কেন এগোচ্ছে না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
বালুর নিচে লুকিয়ে আছে মূল্যবান খনিজ
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) গবেষণায় দেখা গেছে, হিমালয় অববাহিকা থেকে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বালু বাংলাদেশে প্রবেশ করে। গবেষণাসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এর পরিমাণ প্রায় এক বিলিয়ন টন। এই বালুর মধ্যে রয়েছে গারনেট, কোয়ার্টজ, ম্যাগনেটাইট, জিরকন, ইলমেনাইট ও রুটাইলের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান।
আন্তর্জাতিক বাজারে এসব খনিজের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ইলমেনাইট ও রুটাইল টাইটানিয়াম উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। রং, প্লাস্টিক, ওষুধসহ বিভিন্ন শিল্পে টাইটানিয়ামের ব্যবহার রয়েছে। জিরকন ব্যবহৃত হয় সিরামিক, উন্নত প্রযুক্তি ও বিভিন্ন শিল্পপণ্যে। ম্যাগনেটাইট ইস্পাত উৎপাদনসহ ভারী শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অন্যদিকে গারনেট ও কোয়ার্টজ ব্যবহৃত হয় অলংকার, কাচ, ইলেকট্রনিকস এবং শিল্পকারখানার নানা কাজে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খনিজের যথাযথ অনুসন্ধান, পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা তৈরি করা গেলে দেশে নতুন শিল্প খাত গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন খনিজ কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে বালুতে খনিজের উপস্থিতি থাকলেই তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এ জন্য প্রয়োজন বিস্তারিত অনুসন্ধান, খনিজের ঘনত্ব নিরূপণ, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই।
৫০ বছরের মহাপরিকল্পনায় শিল্পায়নের স্বপ্ন
চলতি বছরের ১১ জুন বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের একটি নীতিনির্ধারণী মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ২০২৬ থেকে ২০৭৫ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ১৫ একর জমিতে একটি পাইলট রিসার্চ প্ল্যান্ট এবং রাজারহাট উপজেলার টগরাইহাট এলাকায় ১০ একর জমিতে মূল গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল কেন্দ্রটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মিনারেল স্যান্ডস রিসার্চ হাব’। এখানে খনিজ গবেষণার পাশাপাশি বিরল মৃত্তিকা উপাদান বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস নিয়েও গবেষণার পরিকল্পনা রয়েছে।
গবেষণাকেন্দ্রটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন, স্কাডা প্রযুক্তি, স্মার্ট মাইনিং এবং জিওলজিক্যাল বিগ ডাটা সেন্টার যুক্ত করার কথা রয়েছে। পরিকল্পনাকারীদের প্রত্যাশা, কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু কুড়িগ্রাম নয়, সারা দেশের খনিজ গবেষণা ও শিল্পায়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। খনিজ সম্পদভিত্তিক শিল্পের কাঁচামাল দেশে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়বে।
ইতিমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রস্তাবিত জমির জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে।
ইতিবাচক তথ্যের পরও কেন ফাইলবন্দি
প্রকল্পটির অগ্রগতিতে বড় বাধা তৈরি হয় গত ১৯ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় সভায়। সভার কার্যবিবরণীর ১০ নম্বর আলোচ্য সূচিতে উল্লেখ করা হয়, কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় সরকারের প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য হবে না বলে অভিমত দিয়েছেন।
এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। কারণ জেলা প্রশাসনের দাবি, প্রকল্পের বিরুদ্ধে এমন কোনো প্রতিবেদন তাদের দপ্তর থেকে পাঠানো হয়নি। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ৫ মার্চ কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী ও রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত ও নকশা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছিলেন। ফলে জেলা প্রশাসনের নামে নেতিবাচক অভিমতটি কীভাবে মন্ত্রণালয়ের কার্যবিবরণীতে যুক্ত হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, তাঁর যোগদানের আগে সাবেক জেলা প্রশাসকদের সময়ে বালু গবেষণাকেন্দ্র স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য জমির সব তথ্য-উপাত্ত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু গত ১৯ জুলাইয়ের সভায় জেলা প্রশাসনের যে নেতিবাচক অভিমতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের দপ্তর থেকে এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন কখনোই পাঠানো হয়নি।
তিনি আরও বলেন, এ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জেলাবাসীর আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে।
কুড়িগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বালুতে মূল্যবান ও বিরল খনিজ রয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁরা ইতিমধ্যে জমির সম্ভাব্যতা ও কার্যকারিতা যাচাই শেষ করে অনেক আগেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে যা বলছেন মন্ত্রী
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়টি তাঁর জানা নেই।
তবে বালু গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন নিয়ে কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা তথ্যের বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে থাকলে তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে তা দ্রুত নিরসনের ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।
গবেষকদের চোখে নতুন অর্থনীতির সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) ড. সোহেল রানা বলেন, হিমালয় থেকে আসা ব্রহ্মপুত্রের এই বালু সম্পূর্ণ পুনর্বহনযোগ্য ও নবায়নযোগ্য। এই বালু থেকে রুটাইল, জিরকন ও কোয়ার্টজের মতো হেভি ও লাইট মিনারেল আলাদা করা সম্ভব হলে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে টাইটানিয়াম ও জিরকোনিয়ামভিত্তিক বড় শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
গবেষকদের এমন আশাবাদ কুড়িগ্রামের মানুষের মধ্যেও নতুন স্বপ্ন তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্যা, নদীভাঙন, কর্মসংস্থানের অভাব ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা এ অঞ্চলের মানুষ প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিক মুক্তির সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন।
জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, মেগা প্রকল্পটি শুরুই হয়নি, অথচ মন্ত্রণালয় কীভাবে বলতে পারে এতে লাভ হবে না ক্ষতি হবে? প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মঙ্গাপীড়িত কুড়িগ্রামের দারিদ্র্যের কলঙ্ক মুছে পুরো দেশের অর্থনীতি বদলে যেতে পারে। তাঁরা দ্রুত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন চান।
কুড়িগ্রাম হিতৈষী সংঘের সভাপতি সামিউল হক নান্টু বলেন, কুড়িগ্রামের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, এমন প্রকল্পের বিকল্প নেই। স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই জাতীয় স্বার্থের প্রকল্পে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এক হতে হবে।
সব মিলিয়ে ব্রহ্মপুত্রের বালুতে থাকা খনিজ সম্পদকে ঘিরে কুড়িগ্রামে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন গবেষণা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সমন্বিত উদ্যোগ। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্যের অমিল নিরসন করে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দ্রুত স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
