ডেঙ্গুর প্রকোপে বিপর্যস্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ। টানা আট মাস ধরে দেশের জেলাগুলোর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে জেলাটি। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, ঘটছে প্রাণহানিও। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন প্রায় ৭০০ রোগী। শয্যা না পেয়ে অনেককে হাসপাতালের মেঝে ও সিঁড়িতে অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে চিকিৎসক ও জনবল সংকট।
অপরিকল্পিত ড্রেনেজে বাড়ছে মশার প্রজনন
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ, নিয়মিত পরিষ্কার না করা এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এসব স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তারের ঝুঁকি বাড়ছে। দিন-রাত মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন শহরবাসী।
শহরের শান্তিমোড় এলাকার বাসিন্দা শিমুল বলেন, বিভিন্ন এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার অবস্থা নাজুক। কোথাও ড্রেন নির্মাণের কাজ অসমাপ্ত, আবার কোথাও পানি চলাচলের পথ বন্ধ। এতে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে এবং এডিস মশার লার্ভা জন্মানোর ঝুঁকি বাড়ছে।
পৌরসভার মসজিদপাড়া এলাকার বাসিন্দা সুইট জানান, তার এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কেউ না কেউ জ্বরে ভুগছেন। দিন ও রাত উভয় সময়েই মশার উপদ্রব থাকে। তার দাবি, এলাকায় ডেঙ্গুতে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এরপরও মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তাসলিমা বলেন, মশার কারণে ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তি নেই। পরিচিত অনেক স্বজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে। তিনি দ্রুত কার্যকর মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনার দাবি জানান।
২৫০ শয্যার হাসপাতালে রোগী প্রায় ৭০০
ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে রোগীর চাপ কয়েক গুণ বেড়েছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ভর্তি থাকায় শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে মেঝে ও সিঁড়িতে অবস্থান করেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেককে। এতে রোগীদের পাশাপাশি স্বজনদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জমির মো. হাসিবুস সাত্তার জানান, ফেব্রুয়ারি থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যায় দেশের জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়ছে। হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার হলেও বর্তমানে রোগী ভর্তি রয়েছেন প্রায় ৭০০ জন।
তিনি আরও জানান, হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জামের পর্যাপ্ততা থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবলের অভাব রয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক নিজেসহ অন্তত ৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র আলহাজ মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল মতিন বলেন, জেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। তার দাবি, এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৭৫ থেকে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল এনে চিকিৎসাসেবা জোরদার করা প্রয়োজন।
৩৬ শতাংশ বাড়িতে এডিসের লার্ভা
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার ১৫২টি বসতবাড়িতে জমে থাকা পানি পরীক্ষা করে ৩৬ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এটিকে ডেঙ্গু বিস্তারের বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন অর রশীদ বলেন, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে শহরের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এতে মশার প্রজনন বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসন ও মশার বংশবিস্তার রোধে পৌরসভার পক্ষ থেকে একাধিক বিশেষ দল গঠন করে অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব দল মশার লার্ভা শনাক্ত ও ধ্বংস করার পাশাপাশি ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটাচ্ছে।
জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী জানান, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় পৌর এলাকায় আটটি বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। দলগুলো নিয়মিত বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস, লার্ভা নিধন এবং জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্থায়ী সমাধানের দাবি এলাকাবাসীর
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, শুধু অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক ও জনবল সংকট দূর করে ডেঙ্গু রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি
