Kaler Alo
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬
২০ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমানের চীন সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ১১:২৬ এএম

ঢাকার মাটির নিচে এগোচ্ছে নতুন যোগাযোগপথ, এমআরটি-১-এর চার প্যাকেজে চুক্তি

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৫, ২০২৬, ১১:২৬ এএম

ঢাকার মাটির নিচে এগোচ্ছে নতুন যোগাযোগপথ, এমআরটি-১-এর চার প্যাকেজে চুক্তি

ঢাকার যানজটের চিরচেনা চিত্র বদলে দিতে নগরীর মাটির নিচে গড়ে উঠছে নতুন গণপরিবহন অবকাঠামো। দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়নে চারটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সেই উদ্যোগ আরও এক ধাপ এগিয়েছে। সুড়ঙ্গ ও স্টেশন নির্মাণের পাশাপাশি রেলপথ, বৈদ্যুতিক স্থাপনা, ট্রেন নিয়ন্ত্রণ, সংকেত ও যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপনের কাজও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই অগ্রগতির তাৎপর্য শুধু চারটি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পাতাল রেল চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আধুনিক প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার সমন্বিত বাস্তবায়নের ভিত্তিও তৈরি হলো।

বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে এমআরটি লাইন-৬ ডিপো এলাকায় অবস্থিত মেট্রোরেল ভবনের সম্মেলনকক্ষে এসব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্প রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

  • ৯.৬২৯ কিলোমিটার পাতাল রেলপথ নির্মাণের চুক্তি 
  • যুক্ত হচ্ছে রেলপথ, বিদ্যুৎ, সংকেত ও যোগাযোগব্যবস্থ
  • কাজ সময়মতো শেষ করার তাগিদ সচিবের

পাতাল রেলপথ নির্মাণে যুক্ত হচ্ছে ৯.৬২৯ কিলোমিটার
চারটি প্যাকেজের মধ্যে দুটি সুড়ঙ্গ ও পাতাল স্টেশন নির্মাণের জন্য। এ দুটি প্যাকেজের আওতায় মোট ৯.৬২৯ কিলোমিটার পাতাল রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে সিপি-০৪ প্যাকেজের আওতায় রামপুরা আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে নতুন বাজার স্টেশন পর্যন্ত ৪.৪৪৭ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড রুট নির্মাণ করা হবে। অন্যদিকে, সিপি-০৬ প্যাকেজের আওতায় নদ্দা আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে এয়ারপোর্ট স্টেশন পর্যন্ত নির্মিত হবে ৫.১৮২ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড রুট।

রেলপথ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যুক্ত হবে আধুনিক প্রযুক্তি
সিপি-০৯ প্যাকেজের আওতায় এমআরটি লাইন-১-এর ট্র্যাক ওয়ার্কসের অংশ হিসেবে রেল, টার্নআউট, পয়েন্ট ও ক্রসিংসহ প্রয়োজনীয় কাজ এবং ইলেকট্রিক্যাল ফ্যাসিলিটি স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে ট্রেন চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় রেলপথ ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামো গড়ে উঠবে। অন্যদিকে, সিপি-১০ প্যাকেজের আওতায় স্থাপন করা হবে সিগন্যালিং, টেলিকমিউনিকেশন, প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর এবং এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম।

এর মধ্যে রয়েছে কমিউনিকেশন বেজড অটোমেটিক ট্রেন কন্ট্রোলিং সিস্টেম, অপটিক্যাল ফাইবার বেজড ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক এবং এলটিই প্রযুক্তির রেডিও কমিউনিকেশন ব্যবস্থা। অর্থাৎ, এ প্রকল্পে শুধু পাতাল রেলপথ ও স্টেশন নির্মাণই নয়, একই সঙ্গে ট্রেনের স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ এবং যাত্রী নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তিও স্থাপন করা হবে। ফলে পাতাল রেল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ভিত্তি আরও সুসংহত হবে।

যানজটের চাপ কমিয়ে সময় সাশ্রয়ের প্রত্যাশা
ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ দীর্ঘ যাতায়াত সময়। প্রতিদিন কর্মঘণ্টার বড় একটি অংশ সড়কের যানজটে আটকে থাকতে হয় নগরবাসীকে। এ বাস্তবতায় পাতাল মেট্রোরেল সড়কনির্ভর যোগাযোগের বিকল্প অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি যাতায়াতের সময় কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে।

সড়কের যানজটের বাইরে ভূগর্ভস্থ পথে ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হলে যাত্রীদের যাতায়াত আরও নির্ভরযোগ্য হতে পারে। পাশাপাশি আধুনিক সংকেতব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় ট্রেন নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা রেল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এমআরটি লাইন-১-এর চারটি প্যাকেজের বিশেষত্ব হলো, নির্মাণ অবকাঠামোর পাশাপাশি পরিচালনাগত প্রযুক্তির কাজও একই প্রকল্পের আওতায় এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে একটি সমন্বিত পাতাল গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

সময়মতো কাজ শেষ করার নির্দেশ সচিবের
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক। তিনি বলেন, 'রাজধানীর যানজট নিরসন, যাতায়াতের সময় কমানো এবং নাগরিকদের জন্য আধুনিক ও মানসম্মত গণপরিবহন সেবা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য অর্জনে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণসহ নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও সময়োপযোগী নগর গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।'

দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপান সরকারের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা ও জাইকার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষরকে তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অভিনন্দন জানান।

একই সঙ্গে শ্রম আইনসহ দেশের প্রচলিত সংশ্লিষ্ট আইন মেনে নির্মাণকাজে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন। নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, 'প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ করতে হবে, যাতে নির্মাণকাজের কারণে সাধারণ মানুষের যে সাময়িক ভোগান্তি সৃষ্টি হবে, তা দীর্ঘায়িত না হয়।'

পরিবেশ সুরক্ষা ও জনকল্যাণে গুরুত্ব
সচিব বলেন, নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকল্প এলাকার আশপাশে বসবাসকারী জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, 'প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ (এমপ্লয়ার), প্রকৌশলী (ইঞ্জিনিয়ার) ও ঠিকাদারদের (কন্ট্রাক্টর) মধ্যে স্বচ্ছ, ধারাবাহিক ও কার্যকর সমন্বয় ও যোগাযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।' সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে ঢাকাবাসীর জন্য দ্রুততর, আধুনিক, নিরাপদ ও বিশ্বমানের গণপরিবহন সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

পাতাল রেল বাস্তবায়নে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা ও উন্নয়ন সহযোগিতার প্রশংসা করেন।

মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজের স্থবিরতা কাটিয়ে পুনরায় বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু ও গতিশীল করার উদ্যোগের জন্য তিনি বাংলাদেশ সরকারকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার সহযোগিতামূলক সম্পর্ক ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে জাপান পাশে থাকতে আগ্রহী।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাওগাতুল আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাইকা বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রধান প্রতিনিধি তাকাহাশি জুনকো। এ ছাড়া প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

চার প্যাকেজে নতুন গতি, সামনে সমন্বিত বাস্তবায়নের লক্ষ্য
এমআরটি লাইন-১-এর চারটি প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ ও প্রযুক্তিগত কাজ এগিয়ে নেওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পাতাল রেলপথ নির্মাণের পাশাপাশি রেলপথ, বিদ্যুৎ, সংকেত ও যোগাযোগব্যবস্থার কাজ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরে পাতাল রেল নির্মাণ একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উদ্যোগ।

তাই নির্মাণের গুণগত মান, নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই প্রকল্পের সাফল্য শুধু নতুন রেলপথ নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ঢাকার যাতায়াতব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করা, নাগরিকদের মূল্যবান সময় সাশ্রয় এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের পরিসর বাড়ানোর প্রত্যাশা। চারটি প্যাকেজের চুক্তি সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।

কালের আলো/আরআই/এমকে

Link copied!