গ্রাম পুলিশ সদস্যদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের পদবি পরিবর্তন, নতুন নারী সদস্য নিয়োগ এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত গ্রাম পুলিশের মহাসমাবেশে এসব ঘোষণা দেন তিনি। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গ্রাম পুলিশের মাসিক বেতন ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রাম পুলিশ প্রধানের বেতন ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ হাজার টাকা করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত শনিবার (৭ নভেম্বর) থেকেই কার্যকর হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু পদবি পরিবর্তন নয়, গ্রাম পুলিশের আর্থিক সুযোগ-সুবিধাও বাড়ানো হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বাহিনীর সদস্যদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
বেতন ও আনুতোষিক ভাতা বাড়ল
মহাসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী জানান, গ্রাম পুলিশের মাসিক বেতন ৩ হাজার টাকা বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে গ্রাম পুলিশ প্রধানের বেতনও ৩ হাজার টাকা বাড়িয়ে ১১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া গ্রাম পুলিশের আনুতোষিক ভাতা ৭০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ হাজার টাকা এবং গ্রাম পুলিশ প্রধানের আনুতোষিক ভাতা ৮০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে।
গ্রাম পুলিশ প্রধানের যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি এখন থেকে গ্রাম পুলিশ সদস্যরা প্রতি মাসে ১৫০ টাকা করে মোবাইল ভাতা পাবেন।
পদবি বদলে পরিচয় হবে গ্রাম পুলিশ
গ্রাম পুলিশের পেশাগত পরিচয়েও পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এখন থেকে দফাদার কিংবা মহল্লাদার নয়, তাঁদের পেশাগত পরিচয় হবে গ্রাম পুলিশ। মহল্লাদারদের পরিচয় হবে গ্রাম পুলিশ এবং দফাদারদের পরিচয় হবে গ্রাম পুলিশ প্রধান। এ বিষয়ে সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি ইউনিয়নে নিয়োগ পাবেন আরও দুই নারী গ্রাম পুলিশ
তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে নতুন করে আরও দুজন নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজকে এগিয়ে নিতে নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি। এ লক্ষ্যেই নারী গ্রাম পুলিশের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নারী গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আজ থেকেই কার্যকর হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, সরকার দেশব্যাপী এক লাখ হেলথ ওয়ার্কার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে ৮০ হাজারই হবেন নারী।
গ্রাম পুলিশ সড়ক ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
গ্রাম পুলিশ সদস্যদের কাজের স্বীকৃতি ও সম্মান বাড়াতে প্রতিটি ইউনিয়নের একটি বড় সড়কের নাম ‘গ্রাম পুলিশ সড়ক’ রাখার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। এসব সড়কে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় গাছ লাগানো হবে।
গাছ পরিণত হলে তা বিক্রির অর্থ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। এর মাধ্যমে তাঁদের স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া আগে প্রতি পাঁচ বছর পরপর গ্রাম পুলিশ সদস্যদের বাইসাইকেল দেওয়া হলেও এখন থেকে তিন থেকে সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তা দেওয়ার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব ভূমিকা পালনের আহ্বান
বিগত সরকারের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থাই ধ্বংস হয়নি, রাষ্ট্র ও সমাজেও চূড়ান্ত সামাজিক অবক্ষয় ঘটেছিল। পরিবারে পরিবারে বিরোধ এবং তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিহিংসা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
একটি নিরাপদ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ ও সম্প্রীতি পুনর্গঠনে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে নিজ নিজ এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং বৃক্ষরোপণে সবাইকে এগিয়ে আসার পরামর্শ দেন।
৪১ হাজার গ্রাম পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি
মহাসমাবেশে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা প্রায় ৪১ হাজার গ্রাম পুলিশ সদস্য অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, স্থানীয় সরকার, বিমান ও পর্যটনবিষয়ক মন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
অনুষ্ঠানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
মহাসমাবেশের একপর্যায়ে তৃণমূল পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আট বিভাগের শ্রেষ্ঠ আটজন গ্রাম পুলিশের হাতে বিশেষ সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
কালের আলো/এসআর/এএএন
