Kaler Alo
শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬
২২ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমানের চীন সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৬, ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম

আদিবাসী খাবারের স্বাদ মিলছে মিরপুরে

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৬, ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম

আদিবাসী খাবারের স্বাদ মিলছে মিরপুরে

পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবার, শস্য ও পণ্যের সমাহার নিয়ে রাজধানীর মিরপুরে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী পঞ্চম ‘আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা’। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) মিরপুর-১৩ নম্বরে পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে মেলার উদ্বোধন করা হয়। মেলায় বিন্নি চালের পিঠা, পাহাড়ি পাজন, কলাপাতায় রান্না করা হেবাঙ, জুমে উৎপাদিত শাকসবজিসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও পণ্য পাওয়া যাচ্ছে।

উন্নয়ন সংগঠন নাগরিক উদ্যোগ ও আদিবাসী সুহৃদদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ মেলা চলবে শনিবার (৭ নভেম্বর) পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

মেলার বিভিন্ন স্টলে পাহাড়ের জনপ্রিয় খাবার ও শস্যের পাশাপাশি সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবারও স্থান পেয়েছে। রয়েছে কলাপাতায় রান্না করা বিভিন্ন পদের হেবাঙ, পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী পাজন, জুমে উৎপাদিত সবজি এবং কাপ্তাই লেকের মাছ। মণিপুরি, গারো ও রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও পণ্য নিয়ে অংশ নিয়েছেন।

রাখাইন সম্প্রদায়ের স্টলে পাওয়া যাচ্ছে কালো ও সাদা বিন্নি চাল দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের পিঠা। এ ছাড়া রয়েছে নানা ধরনের মুন্ডি। খাবারের পাশাপাশি পাহাড়ে উৎপাদিত বিভিন্ন শস্য ও পণ্য প্রদর্শন এবং বিক্রি করছেন বিক্রেতারা।

মেলা শুরুর ঘণ্টাখানেকেই শেষ কিছু পণ্য
মেলা শুরুর পর থেকেই দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়। সচিবালয়ে কর্মরত মনোয়ারা বেগম মিরপুর-১৪ নম্বরে পরিবার নিয়ে থাকেন। শুক্রবার ছুটির দিনে তিন বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে মেলায় এসেছিলেন তিনি। এক স্টল থেকে আরেক স্টলে ঘুরেও মেলা শুরুর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মাশরুম ও হলুদ ফুল পাননি।

মনোয়ারা বেগম  বলেন, তাঁর দুটি শিশুসন্তান রয়েছে। বাজার থেকে তাদের জন্য খাবার কিনতে গেলে অনেক সময় মনে হয়, সন্তানদের বিষ খাওয়াচ্ছেন। তাই প্রতিবছর এ মেলায় এসে কেনাকাটা করেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, পাহাড়ের জুমচাষিদের উৎপাদিত ফল ও সবজি সমতলের বাজারের অনেক পণ্যের তুলনায় নিরাপদ।

বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য তুলে ধরার আয়োজন
নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন সংস্কৃতিকর্মী তনয়া দেওয়ান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। এ ছাড়া বক্তব্য দেন নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও মানবাধিকারকর্মী শিরীন পারভীন হক এবং অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমীলা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে দীপেন দেওয়ান বলেন, আদিবাসীদের খাদ্যাভ্যাস তুলে ধরতে এ মেলার আয়োজন প্রশংসনীয়। এ আয়োজন থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির মাধ্যম হিসেবেও মেলাটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে অসংখ্য জাতিসত্তার মানুষের বসবাস, সেই বৈচিত্র্যের চিত্র এ মেলায় ফুটে উঠেছে।

তিনি বলেন, এসব খাবার ও ঐতিহ্য বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য দেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই এগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবাইকে সমানভাবে বিবেচনা করার প্রত্যাশার প্রতিফলন বাস্তব কাজের মধ্য দিয়ে ঘটাতে হবে।

বর্তমান সরকার ‘রেইনবো নেশন’-এর কথা বলেছে উল্লেখ করে দীপেন দেওয়ান বলেন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যাশা যেন শুধু কথায় সীমাবদ্ধ না থাকে। এ জন্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।

জুমচাষ ও নিরাপদ খাদ্যের গুরুত্ব
পাহাড়ের খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি জড়িত বলে মন্তব্য করেন দীপেন দেওয়ান। তিনি বলেন, জুমচাষে রাসায়নিক উপাদান ছাড়াই বিভিন্ন ফসল ও ফলমূল উৎপাদিত হয়। জুমের ধানের পাশাপাশি নানা ধরনের ফসলও পাওয়া যায়। এসব পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব হলে জুমচাষিরা উপকৃত হবেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চাইবেন বলেও জানান তিনি। আদিবাসী খাদ্যাভ্যাস, জুমচাষ ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, নাগরিক উদ্যোগ রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব ছিল, সেই উদ্যোগ নিয়েছে। মেলা থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা প্রচার ও প্রসারে নিজের দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করবেন।

শিরীন পারভীন হক বলেন, এ আয়োজন দেশের বহুজাতি ও বহুসংস্কৃতির মানুষের বসবাসের বিষয়টি তুলে ধরেছে। দেশে খাদ্যে ভেজালের ব্যাপকতার মধ্যে পাহাড়ে উৎপাদিত খাদ্যপণ্য এখনো নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত রয়েছে। নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা সংরক্ষণের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, পাহাড়ের মানুষের খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে ভূমির অধিকার গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু তাঁদের ভূমির অধিকার এখনো স্বীকৃত নয়। প্রতিনিয়ত ভূমি দখলের কারণে তাঁরা উৎপাদনব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পাহাড়ে উৎপাদিত খাদ্যশস্য ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মেইনথিন প্রমীলা বলেন, আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ। আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা মানুষের সামনে তুলে ধরতে এ মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাঁদের খাদ্য উৎপাদনপদ্ধতি সংরক্ষণ ও বিকাশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। এ জন্য ভূমির অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রকে নজর দিতে হবে।

ঢাকায় আদিবাসী পণ্যের বাজার তৈরির দাবি
সভাপতির বক্তব্যে নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, আদিবাসীরা দেশের বাইরের কেউ নন, তাঁরা এ দেশেরই অংশ। তাঁদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরা সবার দায়িত্ব। এ আয়োজনের মাধ্যমে ঢাকায় আদিবাসীদের পণ্য বিক্রির জন্য আলাদা বাজার তৈরির দাবিও জানান তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের ছোট ছোট উদ্যোগ আদিবাসী সংস্কৃতিকে আপন করে নিতে ভূমিকা রাখবে।

আলোচনা পর্ব শেষে প্রধান অতিথি দীপেন দেওয়ান অন্য অতিথিদের সঙ্গে বেলুন উড়িয়ে মেলার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পাহাড়ি শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন।

সন্ধ্যায় থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
মেলার দুই দিনই সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রাখা হয়েছে। এতে সংগীত পরিবেশন করবেন বাংলাদেশ আইডল মং উ চিং মারমা, পাহাড়ের সংগীতশিল্পী বর্ষা চাকমা, বুলু তঞ্চঙ্গ্যা ও গারো শিল্পী মার্কুস চিসিম। পাশাপাশি পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশিত হবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

Link copied!