Kaler Alo
শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬
২১ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমানের চীন সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

ক্রীড়া প্রতিবেদক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৬, ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম

এক জার্সি, ২৩ বছরের আবেগ: রোনালদোর বিদায়ে শেষ হলো এক মহাকাব্য

ক্রীড়া প্রতিবেদক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৬, ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম

এক জার্সি, ২৩ বছরের আবেগ: রোনালদোর বিদায়ে শেষ হলো এক মহাকাব্য

একটি ভিডিও, কয়েকটি কাগজ আর এক কিংবদন্তির বিদায়। পরনে অফ হোয়াইট রঙের টি-শার্ট, হাতে লেখা কিছু কথা। সোফায় বসে ক্যামেরার সামনে নিজের বিদায়ের ঘোষণা পড়ছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। কণ্ঠে আবেগের প্রকাশ খুব বেশি নেই, মুখে মৃদু হাসি। কিন্তু সেই কয়েক মিনিটের বক্তব্যের প্রতিটি শব্দে যেন জমে ছিল ২৩ বছরের স্মৃতি, অসংখ্য স্বপ্ন, আনন্দ, বেদনা আর অপূর্ণতার গল্প।

পর্তুগালের জার্সিতে আর দেখা যাবে না তাঁকে। যে জার্সি গায়ে একদিন আন্তর্জাতিক ফুটবলে যাত্রা শুরু করেছিলেন এক তরুণ, সেই জার্সি পরেই গড়ে তুলেছিলেন ইতিহাস। ২৩ বছর পর সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা এই মহাতারকা। তাঁর বিদায়ে শুধু একটি জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড়ের বিদায় ঘটেনি, শেষ হয়েছে ফুটবলের এক বর্ণিল যুগেরও।

কান্নায় শুরু, আবেগে মোড়ানো বিদায়

রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গল্পে কান্না নতুন কিছু নয়। ২০০৪ সালের ইউরো ফাইনালে গ্রিসের কাছে হারের পর কিশোর রোনালদোর চোখের জল দেখেছিল ফুটবল বিশ্ব। এরপর সময় বদলেছে, বয়স বেড়েছে, অর্জনের ঝুলিও সমৃদ্ধ হয়েছে। কিন্তু আবেগের জায়গাটি বদলায়নি।

২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হেরে পর্তুগালের বিদায়ের পর টানেল ধরে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়ার দৃশ্য এখনো ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। গত বিশ্বকাপেও স্পেনের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে হারের পর কেঁদেছিলেন তিনি। আনন্দের কান্নাও এসেছে তাঁর জীবনে। ২০১৬ সালের ইউরো ফাইনালে চোট পেয়ে মাত্র ২৫ মিনিটে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের উৎসাহ দিয়েছিলেন, অনেকটা ছায়া কোচের ভূমিকায়। শেষ পর্যন্ত পর্তুগাল শিরোপা জিতলে নিজেকে সামলাতে পারেননি রোনালদো।

এবার বিদায়ের ঘোষণা দিতে গিয়ে অবশ্য চোখের জল দেখাননি। কিন্তু তাঁর ঘোষণায় আবেগের যে গভীরতা ছিল, তা ছুঁয়ে গেছে কোটি ভক্তকে। কারণ, এটি কেবল ফুটবল ছাড়ার ঘোষণা নয়; এটি ছিল একটি দেশের হয়ে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ইতি টানা।

১৬ নম্বর থেকে বিশ্বজোড়া ‘সিআর সেভেন’


২০০৩ সালের ২০ আগস্ট কাজাখস্তানের বিপক্ষে পর্তুগালের হয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল রোনালদোর। বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন ১৬ নম্বর জার্সি পরে। পরে কিছুদিন ১৭ নম্বরও পরেছেন। ২০০৭ সালে লুইস ফিগো অবসরে যাওয়ার পর তাঁর গায়ে ওঠে বিখ্যাত ৭ নম্বর জার্সি। সেই সাত নম্বরই একসময় হয়ে ওঠে বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক ব্র্যান্ড—সিআর সেভেন।

শুধু জার্সি নম্বর নয়, নিজের উদ্‌যাপনকেও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন রোনালদো। তাঁর বিখ্যাত ‘সিউউউ’ উদ্‌যাপন ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে অন্য খেলাতেও জায়গা করে নিয়েছে। মাঠে গোল করার পর তাঁর সেই লাফ, শরীর ঘুরিয়ে অবতরণ আর উদ্‌যাপনের ভঙ্গি অনুকরণ করেছেন অসংখ্য তরুণ।

২৩৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ১৪৬টি গোল—পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও গোলের রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন তিনি। ৪৯টি দেশের বিপক্ষে গোল করেছেন। ৩০ বছর বয়সের পরও জাতীয় দলের হয়ে করেছেন ৯৪ গোল। বয়সকে যেন বারবার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন এই ফুটবলার।

রেকর্ডের পর রেকর্ড, তবু অপূর্ণ বিশ্বকাপ


পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে পাঁচটি আসরে গোল করেছেন তিনি। এই প্রতিযোগিতায় তাঁর ম্যাচসংখ্যা ৩০, গোল ১৪—দুটিই রেকর্ড। বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে ২৭ ম্যাচে করেছেন ১১ গোল। ইউরো ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে গোলসংখ্যা ২৫।

বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ৫২ ম্যাচে ৪১ গোল করে সেখানেও সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়েছেন। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ১০টি হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্বও তাঁর। ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র ফুটবলার তিনি। জাতীয় দলের হয়ে জিতেছেন ২০১৬ সালের ইউরো এবং ২০১৯ ও ২০২৫ সালের নেশনস লিগ।

তবে এত অর্জনের পরও একটি আক্ষেপ থেকে গেছে—বিশ্বকাপের শিরোপা। ২০০৬ সালে পর্তুগাল সেমিফাইনালে উঠেছিল, সেটিই বিশ্বকাপে রোনালদোর সর্বোচ্চ সাফল্য। নিজের সেরা সময়ে বিশ্বকাপ জেতার মতো শক্তিশালী দল না পাওয়া কিংবা পরবর্তী সময়ে দলের প্রত্যাশার সঙ্গে নিজের পারফরম্যান্সের সামঞ্জস্য না থাকা—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ট্রফিটি অধরাই থেকে গেছে তাঁর।

যে রাত থেকে শুরু হয়েছিল শেষের গল্প


২০২২ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচটি রোনালদোর ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত। গ্যালারিতে তখন অসংখ্য সমর্থক তাঁর সাত নম্বর জার্সি পরে হাজির হয়েছেন। কারও হাতে রোনালদোর কাটআউট, কারও মুখে তাঁর মুখোশ। অথচ সেই ম্যাচে তাঁকে দেখা গেল বেঞ্চে।

ফুটবল বিশ্ব অবাক হয়েছিল। গ্যালারির দর্শকদের চোখ মাঠের খেলার পাশাপাশি ডাগআউটেও আটকে ছিল। একসময় যিনি ছিলেন পর্তুগালের আক্রমণের প্রধান ভরসা, তাঁকেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বসে থাকতে হয়েছিল। কোচ ফার্নান্দো সান্তোসের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনও তখন আলোচনায় আসে।

পরবর্তী সময়ে বর্তমান কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গেও তাঁর বিরোধের খবর সামনে আসে। একাদশে জায়গা না পাওয়ার পরিস্থিতিতে গত সেপ্টেম্বরে দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান রোনালদো। শাস্তি শেষে নভেম্বরে তাঁকে আবার পর্তুগালের স্কোয়াডে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন ভক্তরা। কিন্তু তার আগেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে দিলেন তিনি।

কোচ চেয়েছিলেন থাকুন, রোনালদো বেছে নিলেন বিদায়


জর্জ জেসুসও চেয়েছিলেন রোনালদো আরও কিছুদিন জাতীয় দলে থাকুন। পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের টিভি চ্যানেল ‘ক্যানাল ১১’–কে তিনি জানান, রোনালদোকে থাকার অনুরোধ করেছিলেন। জেসুসের পরিকল্পনায়ও ছিলেন এই তারকা।

কোচের ভাষায়, ‘এটা সম্পূর্ণভাবে তাঁর সিদ্ধান্ত। প্রথম দল ঘোষণার আগেই এ বিষয়ে আমাদের কথা বলার সুযোগ হয়েছে। আমি তাকে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেছি। আমার সঙ্গে থেকে যাওয়ার অনুরোধ, কারণ তাকে আমার পাশে দরকার ছিল। কিন্তু তার সিদ্ধান্তটা আমাকে মেনে নিতে হবে।’

রোনালদোর প্রশংসা করে জেসুস আরও বলেন, পর্তুগাল, জাতীয় দল ও তরুণদের জন্য তিনি একটি উদাহরণ। দীর্ঘদিন ধরে দেশের ফুটবলে অবদান রাখা এই খেলোয়াড় পর্তুগিজদের কাছে অনন্য হয়ে থাকবেন। এমনকি পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের সদর দপ্তরের অডিটোরিয়ামে রোনালদোর একটি বড় ছবি রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি, যাতে প্রতিদিন সেখানে আসা তরুণ ও সহকর্মীরা তাঁকে দেখতে পারেন।

এক হাজার গোলের পথে, কিন্তু জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ


আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও ক্লাব ফুটবল ছাড়ছেন না রোনালদো। আল নাসরের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় লক্ষ্য পেশাদার ফুটবলে এক হাজার গোলের মাইলফলক স্পর্শ করা।

প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে তাঁর গোলসংখ্যা ৯৮৫। অর্থাৎ এক হাজার গোল পূর্ণ করতে প্রয়োজন আর মাত্র ১৫টি। স্পোর্টিং লিসবন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস ও আল নাসর—প্রতিটি ক্লাবেই নিজের সামর্থ্যের ছাপ রেখেছেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ৪৫০ গোল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে দুই মেয়াদে ১৪৫ গোল এবং জুভেন্টাসের হয়ে ১০১ গোল তাঁর ক্লাব ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান।

২০০৯ সালে পোর্তোর বিপক্ষে প্রায় ৪০ গজ দূর থেকে করা অবিশ্বাস্য গোল, ২০১১ সালে বার্সেলোনার বিপক্ষে কোপা দেল রের ফাইনালে জয়সূচক হেড, ২০১৮ সালে জুভেন্টাসের বিপক্ষে সেই বিখ্যাত বাইসাইকেল কিক—এমন অসংখ্য মুহূর্তে ফুটবলপ্রেমীদের বিস্মিত করেছেন তিনি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে প্রথম প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা, রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইউরোপ জয়, পাঁচবার ব্যালন ডি’অর এবং পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের মতো অর্জন তাঁকে নিয়ে গেছে কিংবদন্তির আসনে।

ট্রফি ফিকে হবে, রেকর্ড ভাঙবে—স্মৃতি থেকে যাবেই


রোনালদোর বিদায়ী বক্তব্যের সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া অংশগুলোর একটি ছিল মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার কথা। তাঁর ভাষায়, গোলের স্মৃতি একসময় ফিকে হয়ে যায়, ট্রফি জাদুঘরে জায়গা পায়, রেকর্ডও একদিন ভেঙে যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে পাওয়া জায়গা সময় কখনো মুছে দিতে পারে না।

কথাগুলো যেন তাঁর নিজের ক্যারিয়ারেরই সারসংক্ষেপ। একসময় মাঠে তাঁর গোল উদ্‌যাপনে কেঁপে উঠত গ্যালারি। তাঁর নাম ধরে চিৎকার করত সমর্থকেরা। আজ সেই একই মানুষ বিদায়ের ভিডিও দেখে আবেগাপ্লুত হচ্ছেন।

লিওনেল মেসির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গত দুই দশকের ফুটবলকে দিয়েছে অন্যরকম রং। মেসিও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিয়েছেন। এবার রোনালদোর বিদায়ে সেই দ্বৈরথের জাতীয় দলের অধ্যায়ও যেন পুরোপুরি স্মৃতির পাতায় চলে গেল।

২৩ বছরের পথচলায় রোনালদো হয়তো বিশ্বকাপ জিততে পারেননি, কিন্তু পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম লিখেছেন স্থায়ীভাবে। তাঁর গোল, রেকর্ড, উদ্‌যাপন কিংবা জার্সি নম্বর—সবই থেকে যাবে ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে। জাতীয় দলের জার্সিতে আর কোনো গোল হবে না, আর কোনো ‘সিউউউ’ শোনা যাবে না পর্তুগালের হয়ে। তবু রোনালদোর গল্প শেষ নয়। কারণ, কিছু কিংবদন্তি মাঠ ছাড়লেও মানুষের হৃদয় থেকে কখনো বিদায় নেন না।

কালের আলো/এসএ/এসএআর

Link copied!