বাজারে ১০ ও ২০ টাকার নোট নিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। অতিরিক্ত ব্যবহারে এই দুই মূল্যমানের অধিকাংশ নোটই জীর্ণ, ছেঁড়া ও ফাটা হয়ে পড়েছে। ফলে বাসের ভাড়া দেওয়া থেকে শুরু করে বাজারে কেনাকাটা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এসব নোট নিয়ে তৈরি হচ্ছে বিব্রতকর পরিস্থিতি। অনেক সময় ছেঁড়া নোট নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন বাসের চালকের সহকারী ও দোকানিরা। এ নিয়ে যাত্রী, পরিবহনকর্মী ও ক্রেতাদের সঙ্গে নিয়মিত বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।
রাজধানীর একটি বাসে ১০ টাকার ছেঁড়া নোট নিয়ে এমনই এক বিবাদের ঘটনা ঘটেছে। বাসযাত্রী ভাড়া হিসেবে ১০ টাকার একটি নোট দিলে তা নিতে অস্বীকৃতি জানান চালকের সহকারী মো. শাহাবুদ্দিন। তাঁর বক্তব্য, নোটটি এতটাই ছেঁড়া যে অন্য কাউকে দিলে তিনিও নিতে চাইবেন না। একপর্যায়ে যাত্রীকে তিনি বলেন, ‘অন্য টেকা থাকলে দেন, না থাকলে নাইমা যান।’ এ কথা থেকেই শুরু হয় ঝগড়া। রাজধানীর ৮ নম্বর রুটের বাসে তিন দিন আগের এ ঘটনা এখনকার নিত্যদিনের ভোগান্তিরই একটি উদাহরণ। ১০ ও ২০ টাকার নোটের ব্যবহার বেশি হওয়ায় এগুলো দ্রুত জীর্ণ হয়ে পড়ছে। ফলে যাত্রী ও পরিবহনকর্মী—কেউই এসব নোট নিতে স্বস্তি বোধ করছেন না।
এক নোট নিয়ে বারবার বিড়ম্বনা
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী জোনায়েদ আহমেদ বলেন, বাজারে থাকা ১০ ও ২০ টাকার বেশিরভাগ নোটের অবস্থাই খারাপ। প্রয়োজনের কারণে বাধ্য হয়ে এসব নোট নিতে হলেও পরে তা খরচ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়।
তিনি বলেন, ‘১০ টাকা আর ২০ টাকার এই দুই নোটের অবস্থা দেখলে মনে হয় যে কেউ নেবে না। একবার নিলে মাথায় চিন্তা শুরু হয়ে যায়, এই টাকা আবার কাকে দেব?’ জোনায়েদ জানান, লোকাল বাসের চালকের সহকারীদের সঙ্গে ছেঁড়া নোট নিয়ে প্রায়ই তাঁর তর্ক হয়। শুধু তিনি নন, বাসের অন্য যাত্রীদেরও মাঝেমধ্যে একই সমস্যায় পড়তে হয়।
পরিবহনকর্মী শাহাবুদ্দিনের বক্তব্যও একই ধরনের। তিনি বলেন, ছেঁড়া নোট নিতে আপত্তি নেই। কিন্তু সেই নোট অন্য যাত্রীকে দিলে তিনি নিতে চান না। দোকানে কেনাকাটা করতে গেলেও দোকানিরা একইভাবে অস্বীকৃতি জানান। সবাই নিলে তাঁরাও নিতে রাজি থাকতেন।
দোকানেও নিতে চান না ছেঁড়া নোট
শুধু গণপরিবহনে নয়, মুদি দোকানেও ১০ ও ২০ টাকার নোট নিয়ে একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। দোকানিরা বলছেন, এই দুই মূল্যমানের নোটের বড় অংশই ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ার মতো জীর্ণ হয়ে পড়েছে। মুদি দোকানি বিল্লাল হোসেন বলেন, প্রতিদিন ১০০টি ১০ টাকার নোট পেলে এর মধ্যে প্রায় ৯৫টিই ছেঁড়া থাকে। বাকি পাঁচটির অবস্থাও খুব ভালো নয়।
তিনি জানান, ক্রেতাদের কাছ থেকে এসব নোট নিতে না চাইলে অনেক সময় তাঁরা অভিযোগ করেন, দোকানি নিজেই তাঁদের এমন নোট দিয়েছেন। ফলে বাধ্য হয়ে নোটগুলো গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু পরে অন্য ক্রেতাকে দিতে গেলে তাঁরাও নিতে চান না।
ছেঁড়া নোট নিয়ে কী করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে বিল্লাল বলেন, যেসব কোম্পানি থেকে পণ্য কেনেন, সেসব কোম্পানির প্রতিনিধিদের দিয়ে নোটগুলো চালানোর চেষ্টা করেন। তাঁরাও নিতে না চাইলে অনেক নোট জমিয়ে গুলিস্তানে গিয়ে বদলে আনেন।
ব্যাংকে বদলের সুযোগ থাকলেও ভোগান্তি
ঢাকার গুলিস্তান ও মতিঝিল এলাকায় নতুন নোট কেনাবেচা হয়। তবে ব্যাংক থেকেও ছেঁড়া নোট বদলে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাও রয়েছে।
তারপরও ব্যাংকে গিয়ে অনেক সময় এ সেবা পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকে ভিড়ের কারণে অনেকে সেখানে যেতে চান না। আবার ব্যাংকে ছেঁড়া নোট বদলে নেওয়া যায়—এ তথ্যও অনেকের জানা নেই। বেসরকারি চাকরিজীবী জোনায়েদ আহমেদের মতে, এই ভোগান্তি কমাতে বাজারে নতুন নোটের সরবরাহ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে ১০ ও ২০ টাকার নতুন নোট দ্রুত বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
২০ টাকার নতুন নোট ছাপানো শুরু
ছেঁড়া ও জীর্ণ নোটের সংকট নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ২০ টাকার নতুন নোট ছাপানো শুরু হয়েছে। ১০ টাকার নোট ছাপানোর কাজও কিছুদিনের মধ্যে শুরু হবে। নতুন নোট বাজারে সরবরাহ বাড়লে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনে ভোগান্তি কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি
