তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনে অর্থায়ন ও জনবল দিয়ে সহায়তার অভিযোগে অন্তত ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে দেশের সব ব্যাংকে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তালিকায় কয়েকটি শিল্প গ্রুপের মালিক, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক কর্মীদের নাম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাঁদের বেশির ভাগই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অথবা দলটির সরকারের সময়ে বিভিন্নভাবে সুবিধাভোগী ছিলেন। তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের কারও কারও ব্যাংক হিসাব গত ৫ আগস্টের পর দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) বিভিন্ন সংস্থার মামলায় জব্দ করা হয়েছে। কেউ কারাগারে রয়েছেন, আবার কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এ কারণে অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের তাৎক্ষণিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এনবিআরের নির্দেশনা ব্যাংকগুলোতে
গত মঙ্গলবার এনবিআরের এক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির চেয়ারম্যান আহসান হাবিব কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের ইঙ্গিত দেন। তিনি জানান, বিশেষ একটি কারণে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) ও আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ ৩৪ ব্যক্তি ও ৩৪টি পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দ করছে।
রাজস্ব বোর্ডের সূত্রের দাবি, ১২টি শিল্প গ্রুপের মালিক পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থায়ন করছেন। এ তালিকায় রয়েছেন সিপাল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। একই অভিযোগে বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের ব্যাংক হিসাবও জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিল্প গ্রুপের যেসব মালিক তালিকায়
ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদী, রেনেসাঁ গ্রুপের মালিক ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, হামিদ গ্রুপের মালিক ও সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং ফেবিয়ান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম।
এ ছাড়া তালিকায় রয়েছেন তুসুকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান বাদল, ওয়েল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবদুস ছালাম, নিপা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খসরু চৌধুরী, অ্যাক্সিস নিটওয়্যারস লিমিটেডের পরিচালক জাহিদ আহমেদ টুলু, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম মোশাররফ হোসেন এবং গিভেন্সি গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুমা খাতুন লিপা।
মিরপুরের আন্দোলনে অর্থ জোগানোর অভিযোগ
রাজধানীর মিরপুর এলাকায় শ্রমিকদের আন্দোলনে অর্থ জোগানোর অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের ব্যাংক হিসাবও জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজনের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগনে আলিফ মোল্লা, জাহাঙ্গীর আলমের সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েল, স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মী কামাল গাজী এবং শুভ নামের এক ব্যক্তি।
অনলাইনে আন্দোলন সমন্বয়ের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অনলাইনে আন্দোলন সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তাঁর নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫টি হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও ফেসবুক পেজের মাধ্যমে আন্দোলনের বিভিন্ন স্থানের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় ১৫০ জন। এ তালিকায় বাহাউদ্দিন নাছিমের ব্যাংক হিসাব জব্দের বিষয়টিও রয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, পোশাক খাতের চলমান অস্থিরতার পেছনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে। এ কাজে কিছু শিল্পমালিকও জড়িত—এমন তথ্য-প্রমাণ সরকারের কাছে রয়েছে বলে জানান তিনি।
ব্যাংক হিসাব জব্দের বিষয়ে এনবিআরের বক্তব্য
ব্যাংক হিসাব জব্দের বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে ব্যাংকগুলোকে ই-মেইলের মাধ্যমে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলো তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের মাধ্যমে যাচাইয়ের বিষয় রয়েছে।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি
