দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ধীরগতিতে চাকরির সুযোগ তৈরি, শ্রমবাজারে নারীদের কম অংশগ্রহণ এবং দক্ষতার ঘাটতির কারণে বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুবিধা কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাবে ধনী হওয়ার আগেই বয়স্ক সমাজে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে দেশ।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ হবে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৫১ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের অনুপাত ১৪ শতাংশে পৌঁছাবে। তখন বাংলাদেশ ‘বয়স্ক সমাজে’ পরিণত হবে।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশের হাতে সময় সীমিত। ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন বা জনমিতিক পরিবর্তনের সুফল পুরোপুরি কাজে লাগাতে দেশটি প্রায় দুই দশক সময় পাবে। কিন্তু কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনো দুর্বল।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারবে না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বাড়তি চাপ সামলাতে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
কর্মক্ষম মানুষের ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অন্যতম বড় সমস্যা অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের কর্মক্ষম মানুষের ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এ সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ।
এমনকি স্নাতক বা তার চেয়ে বেশি শিক্ষিত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশের বেশি আনুষ্ঠানিক চাকরি না পেয়ে অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব কাজে তাঁদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত কম। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও বিপুলসংখ্যক মানুষ মানসম্মত ও স্থিতিশীল কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। এতে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের চিত্র উঠে এসেছে।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার গড়ের অর্ধেক
আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বার্ষিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার এই গড়ের অর্ধেক।
শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হারও তুলনামূলক কম। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে কর্মীর সংখ্যা কমাচ্ছে। একদিকে বড় ও আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন চাকরির সুযোগ সীমিত, অন্যদিকে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের গতি কম। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে শ্রমের জোগান কর্মসংস্থানের চেয়ে ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি হতে পারে। অর্থাৎ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের সবার জন্য পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়বে।
নারীদের অংশগ্রহণ ও দক্ষতার ঘাটতি বড় বাধা
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমবাজারে নারীদের কম অংশগ্রহণ এবং শিক্ষা ও দক্ষতার ধারাবাহিক ঘাটতি দেশের জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সক্ষমতাকে সীমিত করছে।
তরুণদের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা, নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের বাধা দূর করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়তা করা জরুরি। পাশাপাশি শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সমন্বয় প্রয়োজন।
সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন
কর্মসংস্থানের দুর্বলতার পাশাপাশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষায় বাংলাদেশের ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
সরকারি বয়স্ক ভাতা মাসে ৫০০ টাকা। দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের গড় আয়ের তুলনায় এই ভাতার পরিমাণ মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু হলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য উল্লেখযোগ্য পেনশন কর্মসূচি নেই। ফলে ভবিষ্যতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের স্বাস্থ্যসেবা, আয় ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
কর্মসংস্থান তৈরিতে এখনই উদ্যোগের তাগিদ
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ-ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগ নির্ভর করছে দেশটি এখন কী ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করছে তার ওপর। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভালো মানের কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়তা করা, তরুণদের বাজার উপযোগী দক্ষতায় রূপান্তর এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে আসার পথে বাধাগুলো দূর করা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি উন্নয়নের তুলনায় দ্রুত এবং আগেই বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর জেম মেতে, এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকা লিজেলোটে ওনসর্গ এবং বাংলাদেশ ও ভুটানের অপারেশনস ম্যানেজার গেইল মার্টিন।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
