রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর যে প্রত্যাশা নিয়ে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, প্রথম দিনেই তার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ব্যবধান দেখা গেল। বাসের গায়ে নতুন রং, সামনে নতুন কোম্পানির নাম—বাহ্যিক পরিবর্তন চোখে পড়লেও যাত্রীসেবায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। পুরোনো বাসেই ভাঙা জানালা, নড়বড়ে আসন, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ; রাস্তার মাঝখানে থামিয়ে যাত্রী ওঠানো এবং আগের মতোই ওয়েবিল পদ্ধতিতে ভাড়া আদায়। কোথাও আবার দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও বাসের দেখা পাননি যাত্রীরা।
১৮টি পরিবহন কোম্পানিকে একীভূত করে ছয়টি কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রথম দিনের অভিজ্ঞতায় প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীর গণপরিবহনে প্রকৃত শৃঙ্খলা ফিরতে কতটা প্রস্তুত নতুন ব্যবস্থা?
- ছয় রুটে কোম্পানিভিত্তিক চলাচলের প্রথম দিনেই যাত্রীদের হতাশা
- ভাঙা আসন, ওয়েবিলের ভাড়া, বাসের সংকটে প্রশ্নবিদ্ধ নতুন উদ্যোগ
রবিবার (১ নভেম্বর) থেকে রাজধানীর ছয়টি রুটে পরীক্ষামূলকভাবে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল শুরু হয়েছে। সকাল থেকেই বাস চলাচল শুরু হলেও বেলা ১১টার দিকে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় এ কার্যক্রমের। প্রাথমিক পর্যায়ে আগের বাসগুলো দিয়েই নতুন ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছে।
নতুন নামের আড়ালে পুরোনো বাস
রাজধানীর কেরানীগঞ্জ, গুলিস্তান, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট ও কাকরাইল এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ বাসই পুরোনো। শুধু আগের রঙের ওপর নতুন রঙের প্রলেপ দিয়ে কোম্পানির নাম বদলে দেওয়া হয়েছে। ছয়টি রুটের জন্য ছয় ধরনের রং নির্ধারণ করা হলেও প্রথম দিনেই সব বাসে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। কিছু বাসে রুট নম্বরও ছিল না।
কোনো কোনো বাসে নতুন পরিচয়ের পাশাপাশি পুরোনো পরিবহনের নাম ও রংও স্পষ্ট দেখা গেছে। যেমন, সময় পরিবহনের একটি বাসের গায়ে পুরোনো নাম ও রং থাকলেও সামনের ব্যানারে ছিল নতুন কোম্পানির পরিচয়। রজনীগন্ধা, মালঞ্চ, সময় ও মিডলাইন পরিবহনের বাস একীভূত করে ‘ফোর স্টার বাস লাইন’ নামে ঘাটারচর-কাঁচপুর রুটে পরিচালনা করা হচ্ছে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মশিউর রহমান জানান, স্বল্প সময়ের মধ্যে সব বাসের রং পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ৫০০ বাসে নতুন রং করা হয়েছে। বাকি বাসগুলোর রংও দ্রুত পরিবর্তন করা হবে। যেসব বাসে রুট নম্বর নেই, সেগুলোতে নম্বর যুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
যাত্রীসেবায় পরিবর্তন কোথায়?
বাসের বাহ্যিক পরিচয় বদলালেও ভেতরের পরিবেশে পরিবর্তন না আসায় হতাশ যাত্রীরা। অনেক বাসের জানালার কাচ ভাঙা, কোনো কোনো জানালা খোলা বা বন্ধ করা যায় না। নেই জানালার পর্দা, নষ্ট ফ্যান, নড়বড়ে আসন এবং অপরিচ্ছন্ন সিটের পর্দা। অর্থাৎ, নতুন ব্যবস্থার প্রথম দিনেও যাত্রীদের বহন করতে হয়েছে পুরোনো দুর্ভোগ।
ফোর স্টার বাসের যাত্রী মো. নাজির উদ্দীনের অভিজ্ঞতাও তেমন। তিনি বলেন, ‘বাসের শুধু রং পরিবর্তন হয়েছে, বাকি কোনো পরিবর্তন তো হয়নি। এখনো রাস্তার মাঝখানে ব্রেক কষে যাত্রী তোলা হচ্ছে। আশা করেছিলাম, নতুন পদ্ধতিতে যাত্রীসেবা বাড়বে। কিন্তু প্রথম দিনেই সেই আশা ভেঙে গেল।’ যাত্রীদের প্রত্যাশা ছিল, কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা শুরু হলে বাসের মান, ওঠানামার নিয়ম এবং সার্বিক সেবায় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু প্রথম দিনের চিত্রে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
এক ঘণ্টা অপেক্ষা, তবু বাস নেই
নতুন ব্যবস্থার আরেকটি দুর্বলতা হিসেবে সামনে এসেছে বাসের সংকট। রবিবার (০১ নভেম্বর) দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত ফার্মগেট বাস স্টপেজে চিড়িয়াখানা সিটি পরিবহনের অপেক্ষায় থেকেও বাস পাননি কয়েকজন যাত্রী। সদরঘাটগামী বাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় ছিলেন আহাদ রেজা। তাঁর ভাষ্য, প্রায় ৪০ মিনিট দাঁড়িয়েও একটি বাসের দেখা পাননি তিনি।
এই অভিজ্ঞতা নতুন ব্যবস্থার বাসের সংখ্যা ও চলাচলের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। কোম্পানির অধীনে বাস একীভূত করার ফলে কোনো কোনো রুটে গাড়ির সংখ্যা কমে যাওয়ায় যাত্রীদের অপেক্ষার সময়ও বাড়তে পারে।
প্রজাপতি ও পরিস্থান পরিবহন একীভূত করে গঠন করা হয়েছে পিএনপি সিটি পরিবহন। আগে পরিস্থান পরিবহনের চালক হিসেবে কাজ করতেন মো. আকাশ। তিনি জানান, তিনটি পরিবহনের অধীনে প্রায় ৩০০টি বাস ছিল। এর মধ্যে ১৫০টি নতুন কোম্পানির অধীনে রাখা হয়েছে। বাকি বাসগুলোর আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ায় সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট রুটে বাসের সংখ্যা কমেছে।
ওয়েবিলেই ভাড়া, চালু হয়নি ই-টিকিট
বাস রুট রেশনালাইজেশনের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল ভাড়া আদায় ও যাত্রী ওঠানামায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু প্রথম দিনেও বাসগুলোতে আগের মতো ওয়েবিল পদ্ধতিতে ভাড়া আদায় করা হয়েছে। কোনো বাসে চালু হয়নি ই-টিকিট ব্যবস্থা।
টঙ্গী-কলেজগেট রুটে চলাচলকারী শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস ঢাকা চাকার চেয়ারম্যান মন্টু মিয়া জানান, আপাতত কাউন্টারভিত্তিক যাত্রী তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। যাত্রীছাউনি আছে, এমন নির্ধারিত স্থানে বাস থামানোর কথা ভাবা হচ্ছে। এর বাইরে সড়কের মাঝখানে ইচ্ছামতো যাত্রী ওঠানামা বন্ধের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।।শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসের ভাড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব বাসে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেশি। তাই সাধারণ বাসের মতো প্রতি কিলোমিটারে একই ভাড়া রাখা সম্ভব হবে না।
চালকদের বেতনভিত্তিক নিয়োগ
বাস রুট রেশনালাইজেশনের পরিকল্পনায় চালকদের নির্দিষ্ট বেতনে নিয়োগ এবং পরিবহন মালিকদের কোম্পানির আয় অনুযায়ী লভ্যাংশ দেওয়ার কথা রয়েছে। এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে বেশি যাত্রী তোলার জন্য চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমবে এবং বাস চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানান, চালক ও শ্রমিকদের বেতনভিত্তিক নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে তাঁদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে না।
তিনি আরও জানান, আপাতত একটি রুটে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস চলবে। পাঁচটি রুটে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি বাসগুলো কিনতে হবে। দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে আরও চারটি রুটে বাস চালু করা হবে।
কালের আলো/আরআই/এমকে
