Kaler Alo
রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬
১৬ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: নভেম্বর ১, ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব বাড়াতে ইসলামি দলগুলোর দৌড়ঝাঁপ

কালের আলো রিপোর্ট

প্রকাশিত: নভেম্বর ১, ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব বাড়াতে ইসলামি দলগুলোর দৌড়ঝাঁপ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রভাব ও পরিচিতি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে দেশের ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের ধারাবাহিক বিদেশ সফর, বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগে এই প্রবণতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এত দিন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও এখন পশ্চিমা বিশ্বসহ বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিসরেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে আগ্রহী দলগুলো।

  • মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কে শীর্ষ নেতাদের সফর; প্রবাসী নেটওয়ার্ক 
  • বিদেশি রাজনৈতিক মহল, শিক্ষাবিদ ও প্রবাসীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে তৎপরতা 
  • ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, আফগানিস্তান, নেপালসহ বিভিন্ন দেশে নেতাদের সফর কেবল ধর্মীয় বা সাংগঠনিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এসব সফরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগের গুরুত্ব নতুন মাত্রা পেয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার পাশাপাশি বিদেশি রাজনৈতিক মহল, প্রবাসী জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে ইসলামি দলগুলো। তবে এই যোগাযোগ কতটা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সম্পর্ক কিংবা আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সহযোগিতায় রূপ নেবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

মালয়েশিয়া সফরে মামুনুল হক, ২২ দেশে সাংগঠনিক কার্যক্রমের দাবি
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফর দলটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগের উদ্যোগকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। পাঁচ দিনের সফর শেষে ২৬ অক্টোবর রাতে দেশে ফেরেন তিনি। গত ২২ অক্টোবর দলের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন মামুনুল হক।

প্রতিনিধিদলে ছিলেন দলের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা ফয়সল আহমদ। দলীয় সূত্র বলছে, সফরে বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগের কর্মসূচি ছিল। অর্থাৎ ধর্মীয় ও সাংগঠনিক সম্পর্কের পাশাপাশি শিক্ষা ও অর্থনৈতিক যোগাযোগকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দলটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ২২টি দেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক কার্যক্রম রয়েছে। তিনি নিজেও সৌদি আরব ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। ভবিষ্যতে দলের আমিরের আরও বিদেশ সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তান এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নেপাল সফর করেন মামুনুল হক। আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে ওলামা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়ে কাবুলে যান তিনি। সেখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য, মানবাধিকার ও নারী অধিকারের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে রেজাউল করীম, প্রবাসী যোগাযোগের বাইরে রাজনৈতিক সম্পর্কের উদ্যোগ
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের যুক্তরাষ্ট্র সফর দলটির আন্তর্জাতিক তৎপরতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সফরে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি, মসজিদ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।

ধর্মীয় আলোচনা ও দাওয়াতি কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সুফিবাদের অনুসারীদের সঙ্গেও তার যোগাযোগের কথা জানা গেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বৈঠক এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে দলটির নেতারা এ সফরকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণের উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চান না। ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমানের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রে দলের নেতাকর্মী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম রয়েছে। তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণই ছিল সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।

দলটির সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করিম মারুফের মতে, এ ধরনের সফরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মুসলিম কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সম্পর্কে বিদেশে প্রচলিত ধারণার বাইরে দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও চিন্তাধারা তুলে ধরাও গুরুত্বপূর্ণ।

দলীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে ইসলামী আন্দোলন একটি সাত সদস্যের আন্তর্জাতিক উপকমিটির কার্যক্রম জোরদার করেছে। আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ড. বেলেল নুর আজিজির নেতৃত্বাধীন এ কমিটিতে সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহসহ কয়েকজন নেতা রয়েছেন। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জার্মানি, ইরান, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথাও জানিয়েছে দলটি।

জামায়াতের আন্তর্জাতিক যোগাযোগেও গতি
আন্তর্জাতিক পরিসরে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক কার্যক্রমও উল্লেখযোগ্য। গত সেপ্টেম্বরে দলটির ৩৪ সংসদ সদস্য মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইন সফর করেন। দলটির পক্ষ থেকে এ সফরকে শিক্ষামূলক ও অভিজ্ঞতা অর্জনের কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সফরে মালয়েশিয়ার সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বৈঠক, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং সিঙ্গাপুরের উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। এর ধারাবাহিকতায় গত ৭ অক্টোবর জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তুরস্ক সফরে যান। ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার সম্ভাবনা ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে আলোচনার কর্মসূচি ছিল তার সফরে। ১১ অক্টোবর দেশে ফেরেন তিনি।

আন্তর্জাতিক যোগাযোগে গুরুত্ব দিচ্ছে ইসলামি দলগুলো?
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ইসলামি দলগুলোর সাম্প্রতিক বিদেশ সফরকে কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। প্রথমত, আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো দলের অবস্থান শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিদেশি রাজনৈতিক মহল, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক দর্শন ও সাংগঠনিক অবস্থান তুলে ধরাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পরিসরে যেসব ধারণা প্রচলিত রয়েছে, সেগুলোর বাইরে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ তৈরি করতে চায় দলগুলো।

দ্বিতীয়ত, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে সম্পর্ক। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করেন। তাদের সঙ্গে সাংগঠনিক ও সামাজিক যোগাযোগ রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে দলগুলো নিজেদের কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বাইরেও সাংগঠনিক উপস্থিতি দৃশ্যমান করতে পারে।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দল, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, ব্যবসায়ী ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে সংসদ সদস্যদের বিদেশ সফরকে দলগুলো এ ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জনের কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরছে।

চতুর্থত, বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তর্জাতিক অবস্থান ও যোগাযোগ নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইসলামি দলগুলোও নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়, সাংগঠনিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরতে চাইছে।

কালের আলো/জেএন/এমকে

Link copied!