বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্বের অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে আগেই সরে এসেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। তবে প্রকল্পটি ঘিরে বিতর্ক ও প্রশ্নের মুখে এবার এর গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।
যদিও এসব নথি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হবে না। কঠোর গোপনীয়তার শর্তে কেবল ফিফা কাউন্সিলের সদস্যরাই তা দেখার সুযোগ পাবেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বাতিল হওয়া ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলো তাদের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
দুই সপ্তাহের মধ্যে আবেদন করতে হবে কাউন্সিল সদস্যদের
৩৭ সদস্যের ফিফা কাউন্সিলের সদস্যদের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে নথি দেখার জন্য আবেদন করতে হবে। এরপর সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার সদর দপ্তরে সশরীরে উপস্থিত হয়ে নির্ধারিত নথিগুলো পর্যালোচনা করতে পারবেন তারা।
তবে এ ক্ষেত্রে মানতে হবে কঠোর গোপনীয়তার শর্ত। ফিফার দাবি, সংশ্লিষ্ট তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার বাধ্যবাধকতা থেকেই এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কাউন্সিল সদস্যরা নথি দেখার সুযোগ পেলেও সেগুলো সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করা হবে না।
৪২০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘিরে বিতর্ক
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা ছিল, বিশ্বকাপসহ সংস্থাটির বড় প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা। ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামের এই প্রকল্পের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৪২০ কোটি ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৫২ হাজার ২২৭ কোটি টাকা।
তবে পরিকল্পনাটি প্রকাশ্যে আসার পরই ফুটবল বিশ্বে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এই উদ্যোগের কঠোর বিরোধিতা করে। শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে সমালোচনা ও প্রতিবাদের মুখে গত জুলাইয়ে প্রকল্পটি বাতিল করে ফিফা।
প্রকল্প বাতিল হলেও কাটেনি বিতর্ক
প্রকল্পটি বাতিলের পরও বিতর্কের অবসান হয়নি। কীভাবে এমন একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল, কারা এর অনুমোদন দিয়েছিলেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কী ভূমিকা ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর চেয়ে আসছে উয়েফা। সোমবার (২ নভেম্বর) রাতে ফিফার নতুন সিদ্ধান্তের খবর সামনে আসে। ওই দিনই প্রকল্পটির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ফিফাকে দেওয়া উয়েফার সময়সীমা শেষ হয়।
এর আগে গত মাসে ফিফা কাউন্সিলের এক উত্তপ্ত সভায় বিতর্কিত প্রকল্পটির জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন ইনফান্তিনো। তবে পরিকল্পনাটি তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি। ওই সভায় কাউন্সিল সদস্যদের প্রশ্নগুলো লিখিতভাবে জমা দেওয়ার আহ্বান জানান ফিফা সভাপতি।
এরপর প্রকল্পের বিস্তারিত নথি প্রকাশ এবং বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ফিফাকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয় উয়েফা। সেই সময়সীমা শেষ হলেও সব প্রশ্নের সরাসরি জবাব এখনও পাওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে কাউন্সিল সদস্যদের সীমিত পরিসরে নথি দেখার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফিফা।
ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে বাড়ছে চাপ
বিতর্কিত প্রকল্পের পাশাপাশি ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে উয়েফা। আগামী ফিফা সভাপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে তার বিরুদ্ধে সংস্থাটির অবস্থান আরও কঠোর হচ্ছে। নির্বাচনের আগে কিংবা নির্বাচনের মাধ্যমে ইনফান্তিনোকে সরানোর চেষ্টাও চালাচ্ছে ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
২০১৬ সাল থেকে ফিফা সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন ইনফান্তিনো। আগামী ১৮ মার্চ মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে চতুর্থ ও শেষ মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান তিনি। নির্বাচিত হলে ২০৩১ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন এই কর্মকর্তা।
তবে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব নিয়ে বিতর্কিত পরিকল্পনা এবং সেটি তৈরির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ তার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ফিফা কাউন্সিলের সদস্যদের নথি দেখার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে সেই বিতর্ক কতটা প্রশমিত হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। সূত্র: ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম
কালের আলো/এসএ/এমএএইচ
