Kaler Alo
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬
১৮ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

ফিচার ডেস্ক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম

মুঘল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ নারী ব্যবসায়ীর অজানা ইতিহাস

ফিচার ডেস্ক, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম

মুঘল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ নারী ব্যবসায়ীর অজানা ইতিহাস

মুঘল সম্রাট আকবরের স্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে পরিচিত মরিয়ম-উজ-জামানি ছিলেন শুধু রাজপরিবারের প্রভাবশালী সদস্য নন, ছিলেন সে সময়ের অন্যতম ধনী ও সফল নারী ব্যবসায়ী। সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশাল জাহাজের বহর পরিচালনা এবং হজযাত্রী পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে তাঁর ছিল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। এমনকি তাঁর মালিকানাধীন জাহাজ আটক করার ঘটনায় পর্তুগিজদের সঙ্গে মুঘল সাম্রাজ্যের বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হয়েছিল।

ইতিহাসের পাতায় এই নারী ব্যবসায়ীর পরিচয় অনেকের কাছেই অজানা। অথচ তাঁর ব্যবসায়িক প্রভাব এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, তাঁর জাহাজ আটকের পর পর্তুগিজদের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল এবং মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন।

রাজপুত রাজকন্যা থেকে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রভাবশালী নারী

সম্রাট আকবর ও তার স্ত্রী মরিয়ম-উজ-জামানি


মরিয়ম-উজ-জামানি ছিল তাঁর উপাধি। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, তাঁর জন্মনাম ছিল হরখাবাঈ। ১৫৬২ সালে রাজপুত এই রাজকন্যার সঙ্গে মুঘল সম্রাট আকবরের বিয়ে হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁদের ঘরে জন্ম নেন নুরুদ্দিন মুহাম্মদ, যিনি ইতিহাসে সম্রাট জাহাঙ্গীর নামে পরিচিত।

ছেলের জন্মের পর আকবর তাঁর স্ত্রীকে ‘মরিয়ম-উজ-জামানি’ উপাধিতে ভূষিত করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মুঘল রাজপরিবারের অন্যতম প্রভাবশালী ও সম্পদশালী নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। ঐতিহাসিক রুবি লাল ও ইরা মুখোটির লেখায় তাঁর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের নানা দিক উঠে এসেছে। ১৬২৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি রাজমাতার মর্যাদা ও প্রভাব ধরে রেখেছিলেন।

ব্যবসা ছিল ভারত থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে
মরিয়ম-উজ-জামানির ব্যবসার পরিধি শুধু মুঘল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারত মহাসাগর ও লোহিত সাগর হয়ে আরব উপদ্বীপসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে তাঁর বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। ‘আমেরিকান ওরিয়েন্টাল সোসাইটি’র সাময়িকীতে প্রকাশিত অ্যালিসন ব্যাংকস ফাইন্ডলির গবেষণাপত্রে তাঁকে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী বণিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যবসা পরিচালনার জন্য তিনি অসংখ্য প্রতিনিধি, দালাল ও আর্থিক উপদেষ্টা নিয়োগ করেছিলেন। তাঁদের মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির কাজ পরিচালিত হতো। ভারত থেকে নীল, তুলা, রেশম, চামড়া, ধাতু, কার্পেট, মসলা, আফিম ও মূল্যবান রত্ন রপ্তানি করা হতো। অন্যদিকে সোনা, রুপা, হাতির দাঁত, মুক্তা, অ্যাম্বার, সুগন্ধি, মদ, মাটির ও কাচের পাত্র আমদানি করা হতো।

‘রহিমি’ ছিল তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত জাহাজ

‘রহিমি’


মরিয়ম-উজ-জামানির মালিকানাধীন একাধিক জাহাজের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল ‘রহিমি’। এটি শুধু পণ্য পরিবহনের জাহাজ ছিল না, হজযাত্রীদের মক্কায় যাতায়াতের জন্যও ব্যবহৃত হতো।

ভারতের সুরাট বন্দর থেকে হজযাত্রীদের নিয়ে জাহাজটি লোহিত সাগরের মোহনায় অবস্থিত ইয়েমেনের মোখা বন্দরের দিকে যাত্রা করত। ইউরোপীয়দের কাছে এটি ‘দ্য গ্রেট পিলগ্রিম শিপ’ বা মহান হজযাত্রীবাহী জাহাজ নামে পরিচিত ছিল।

ইতিহাসবিদ ইরা মুখোটির তথ্য অনুযায়ী, রহিমি ছিল সে সময় ভারত মহাসাগরের বৃহত্তম জাহাজগুলোর একটি। এতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ যাত্রী বহনের সক্ষমতা ছিল। পাশাপাশি প্রায় এক লাখ পাউন্ড মূল্যের পণ্য পরিবহন করতে পারত। জাহাজটির বিশাল বাণিজ্যিক সক্ষমতা এবং হজযাত্রী পরিবহনের কারণে এটি মুঘল সাম্রাজ্যের সমুদ্রবাণিজ্যে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত।

পর্তুগিজদের সঙ্গে শুরু হয় সংঘাত

আকবর নামায় বর্ণিত মুঘল সাম্রাজ্যকালে জলপথে আক্রমণ

মরিয়ম-উজ-জামানির ব্যবসায়িক পথ সব সময় মসৃণ ছিল না। ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারকারী পর্তুগিজ বণিকদের সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ফস্টারের লেখা অনুযায়ী, ১৬০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রহিমি মোখার উদ্দেশে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে সময় পর্তুগিজরা জাহাজটির কাছে লাইসেন্সের জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করে। অর্থ না দিলে জাহাজটি গুজরাটের দিউ বন্দরে নিয়ে যাওয়ার হুমকিও দেয়। পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলেও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি।

এরপর ১৬১০ সালের শেষ দিকে বা ১৬১১ সালের শুরুর দিকে নীলের একটি বড় চালান সংগ্রহের উদ্যোগ নেন মরিয়ম-উজ-জামানি। কিন্তু ইংরেজ বণিক উইলিয়াম ফিঞ্চ বেশি দাম দিয়ে পণ্যটি কিনে নেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে অভিযোগ করেন। এর প্রভাব পড়ে মুঘল দরবারে ব্রিটিশ প্রতিনিধি উইলিয়াম হকিন্সের অবস্থানের ওপর। ফলে মুঘল দরবারে ইংরেজ বণিকদের বাণিজ্যিক অবস্থান নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়।

১৬১৩ সালে আটক হয় ‘রহিমি’
১৬১৩ সালে বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পর লোহিত সাগরে রহিমির পথ অবরোধ করে পর্তুগিজরা। এরপর জাহাজটি আটক করে গোয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। জাহাজটিতে পর্তুগিজদের দেওয়া লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও তারা পণ্যসামগ্রীসহ প্রায় ৭০০ যাত্রীকে আটক করে। এতে মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে পর্তুগিজদের সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি ঘটে।

অ্যালিসন ব্যাংকস ফাইন্ডলির গবেষণায় বলা হয়েছে, জাহাজ উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসার পর সম্রাট জাহাঙ্গীর কঠোর পদক্ষেপ নেন। তিনি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর সুরাট থেকে পর্তুগিজদের সঙ্গে নৌবাণিজ্য বন্ধের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণাধীন দামান শহর দখল ও অবরোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে পর্তুগিজরা মুঘল সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করে। জাহাজের ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং লোহিত সাগরগামী স্থানীয় জাহাজগুলোকে অতিরিক্ত লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে তারা রাজি হয়। তবে শর্ত ছিল, মুঘল দরবার থেকে ব্রিটিশদের বহিষ্কার করতে হবে। জাহাঙ্গীর এই শর্ত মেনে নেননি। ব্রিটিশ নথি অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত পর্তুগিজদের তিন লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল। তবে রহিমি আর আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি।

পর্তুগিজদের সঙ্গে সংঘাতে লাভবান হয় ব্রিটিশরা
রহিমি আটকের ঘটনা শুধু মুঘল ও পর্তুগিজদের সম্পর্কেই প্রভাব ফেলেনি, বরং ভারতীয় উপমহাদেশে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার চিত্রও বদলে দেয়। ইতিহাসবিদদের মতে, জাহাঙ্গীরের শাসনামলে মুঘল দরবারে ব্রিটিশ বণিকদের প্রভাব বাড়ছিল। এতে ভারত মহাসাগরে নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য হারানোর আশঙ্কা করছিল পর্তুগিজরা।

মুঘল সম্রাটের মায়ের মালিকানাধীন জাহাজ আটক করে তাঁকে চাপে ফেলার চেষ্টা ছিল পর্তুগিজদের কৌশলের অংশ। কিন্তু এর ফল উল্টো হয়। পর্তুগিজদের সঙ্গে মুঘলদের বিরোধ বাড়ে এবং ব্রিটিশরা বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

রহিমি হারিয়েও থেমে থাকেননি মরিয়ম-উজ-জামানি

‘গঞ্জ-ই-সাওয়াই’

নিজের সবচেয়ে বিখ্যাত জাহাজ হারানোর পরও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করেননি মরিয়ম-উজ-জামানি। তাঁর আরও কয়েকটি জাহাজ ছিল, যেগুলো দিয়ে পণ্য পরিবহন ও হজযাত্রীদের যাতায়াত অব্যাহত রাখা হয়। ১৬১৭ সালে লোহিত সাগর থেকে ফেরার পথে তাঁর মালিকানাধীন আরেকটি জাহাজ দখলের চেষ্টা করে দুই ইংরেজ জলদস্যু। জাহাজটিতে হজযাত্রী ও মূল্যবান পণ্যসামগ্রী ছিল। তবে সময়মতো সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

‘জার্নাল অব ইন্ডিয়ান স্টাডিজ’-এ প্রকাশিত আয়েশা সফদর ও মোহাম্মদ আজম খানের গবেষণা অনুযায়ী, রহিমি হারানোর পর মরিয়ম-উজ-জামানি আরও বড় একটি জাহাজ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। নতুন জাহাজটির নাম দেওয়া হয় ‘গঞ্জ-ই-সাওয়াই’। এতে ৬২টি কামান এবং ৪০০-এর বেশি গোলন্দাজ রাখার ব্যবস্থা ছিল। বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি হজযাত্রীদের নিরাপদে মক্কায় যাতায়াত নিশ্চিত করাও ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

মসজিদ নির্মাণ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও অবদান

বেগম শাহী মসজিদ

ব্যবসা ও রাজনীতির পাশাপাশি মরিয়ম-উজ-জামানি বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও সম্পদ ব্যয় করেছিলেন। তাঁর উদ্যোগে বাগান, কূপ ও মসজিদ নির্মাণের তথ্য পাওয়া যায়।

সৈয়দ মুহাম্মদ লতিফের ‘লাহোরের ইতিহাস’ বইয়ে উল্লেখ রয়েছে, ১৬১৪ সালে তিনি লাহোরে মরিয়ম-উজ-জামানি মসজিদ নির্মাণ করেন। এটি বেগম শাহী মসজিদ নামেও পরিচিত। লাহোরের ঐতিহাসিক মস্তি দরওয়াজার কাছে অবস্থিত মসজিদটি আজও তাঁর স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের স্মারক।

মুঘল নারীদের ব্যবসায়িক উত্তরাধিকারে তাঁর প্রভাব

মরিয়ম-উজ-জামানি

ইতিহাসবিদদের মতে, মরিয়ম-উজ-জামানি ছিলেন উপমহাদেশের প্রথম দিকের এমন একজন রাজবংশীয় নারী, যিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত বাণিজ্য পরিচালনা করতেন। পরবর্তী সময়ে নূরজাহান ও জাহানারা বেগমের মতো মুঘল রাজপরিবারের নারীরাও ব্যবসা ও বৈদেশিক বাণিজ্যে যুক্ত হন। তাঁদের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের পেছনে মরিয়ম-উজ-জামানির মতো প্রভাবশালী নারীদের উত্তরাধিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।

আকবরের স্ত্রী হিসেবে পরিচিত এই নারী শুধু রাজপরিবারের ক্ষমতার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং সমুদ্রবাণিজ্য, আন্তর্জাতিক বাজার, জাহাজ পরিচালনা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন। পর্তুগিজদের হাতে রহিমি হারানোর পরও তাঁর ব্যবসায়িক যাত্রা থেমে যায়নি। ইতিহাসে তাই মরিয়ম-উজ-জামানি শুধু একজন সম্রাজ্ঞী নন, বরং মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী নারী উদ্যোক্তা হিসেবেও স্মরণীয়। সূত্র: বিবিসি গুজরাতি

কালের আলো/এসএ/জেএন

Link copied!