ঢাকার সড়কে ই-রিকশার সংখ্যা কত, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। কোন এলাকায় কতটি চলবে, সেটিও চূড়ান্ত হয়নি। অথচ শুরু হয়ে গেছে নিবন্ধন কার্যক্রম। একজনের নামে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। চালকের লাইসেন্সের ব্যবস্থা হবে আরও পরে। এমন বাস্তবতায় ই-রিকশাকে নিয়মের মধ্যে আনার উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
- ঢাকায় কতটি ই-রিকশা চলবে, নির্ধারিত হয়নি সেই সংখ্যা; একজনের নামে পাঁচটি পর্যন্ত নিবন্ধনের সুযোগ
- চালকের লাইসেন্স পরে, রুট ও জোনও চূড়ান্ত নয়
- শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগে বিশৃঙ্খলা বাড়ার শঙ্কা
রাজধানীর অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক—কোথাও ই-রিকশার অবাধ চলাচল, কোথাও বেপরোয়া গতি, আবার কোথাও যত্রতত্র পার্কিং। এসব নিয়ন্ত্রণে নিবন্ধন, নির্দিষ্ট রুট, গতিসীমা ও কারিগরি মান বেঁধে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ইতিমধ্যে আবেদন ফরম বিতরণও শুরু করেছে। কিন্তু সড়কের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যানবাহনের সংখ্যা নির্ধারণ না করে নিবন্ধন শুরু করায় নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা বাড়লেও যদি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে সড়কের পরিস্থিতি বদলাবে কতটা?
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, রাজধানীতে অন্তত ১৫ লাখ ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচল করছে। তবে এর মধ্যে কতটি ই-রিকশা, কতটি নিবন্ধনের উপযোগী এবং ঢাকার সড়কে কতটি চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে রাজধানীকে আটটি জোনে ভাগ করে ভিন্ন রঙের ই-রিকশা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্দেশ্য, এক এলাকার গাড়ি যেন অন্য এলাকায় গিয়ে চলাচল করতে না পারে।
কিন্তু জোন ভাগ করলেই কি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব? অলিগলি থেকে প্রধান সড়কে উঠে আসা, নির্ধারিত এলাকার বাইরে চলাচল এবং নিষিদ্ধ সড়কে ই-রিকশার প্রবেশ ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি না থাকলে রঙের পার্থক্য কিংবা নিবন্ধন নম্বর খুব বেশি কাজে আসবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ফরম বিতরণ শুরু, অনুমোদিত সংখ্যা অনিশ্চিত
গত মঙ্গলবার থেকে ই-রিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করেছে ডিএসসিসি। নগর ভবন ও আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে আবেদন ফরম দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি ফরমের মূল্য ১০০ টাকা। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ফরম সংগ্রহ করা যাবে। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচটি ফরম নিতে পারবেন। ডিএসসিসি এলাকাকে চারটি জোনে ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বর ডিএসসিসি ও বাংলাদেশ পুলিশের যৌথসভায় জোনের সীমানা এবং প্রতিটি এলাকায় সম্ভাব্য যানবাহনের সংখ্যা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
তবে আবেদন ফরম সংগ্রহ করলেই গাড়ি চালানোর অনুমতি মিলবে না। আবেদন যাচাই, নির্ধারিত নকশা অনুসরণ এবং কারিগরি শর্ত পূরণের পরই নিবন্ধনের সুযোগ পাওয়া যাবে। ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, একসঙ্গে সব অটোরিকশা বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই ধাপে ধাপে সেগুলোকে নিয়মের আওতায় আনা হবে। প্রথম পর্যায়ে ৫০০, ১ হাজার কিংবা ২ হাজার—যতগুলো যানবাহন শর্ত পূরণ করবে, সেগুলোকে নিবন্ধনের অনুমোদন দেওয়া হবে।
তিনি জানান, নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি মান অনুসরণ করে গাড়ি তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অনুমোদন বা কারিগরি ছাড়পত্র নিতে হবে। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে পর্যায়ক্রমে নিবন্ধন দেওয়া হবে। ই-রিকশা তৈরির জন্য নির্ধারিত মডেলের ওয়ার্কশপ এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধে ওয়ার্ড বা থানা পর্যায়ে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংখ্যা না বেঁধে নিবন্ধন, বাড়তে পারে গাড়ি
নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগ যানবাহনের সংখ্যা নিয়ে। বিধিমালায় সিটি করপোরেশনকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে অনুমোদিত যানবাহনের সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ডিএসসিসি এলাকায় কতটি ই-রিকশা চলবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
অন্যদিকে, একজন জাতীয় পরিচয়পত্রধারীর নামে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ একজন মালিক একাধিক গাড়ির নিবন্ধন নিতে পারবেন। একাধিক ব্যক্তি এই সুযোগ নিলে মোট নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তার কোনো স্পষ্ট সীমা এখনো সামনে আসেনি।
এ অবস্থায় আগে যানবাহনের সংখ্যা নির্ধারণ, নাকি আগে নিবন্ধন—এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সড়কের ধারণক্ষমতা ও গণপরিবহনের প্রয়োজন বিবেচনায় না নিয়ে নিবন্ধন দেওয়া হলে নতুন করে আরও ই-রিকশা নামানোর প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তাতে নিয়ন্ত্রণের বদলে যানবাহনের চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, ই-রিকশার অবাধ চলাচলে অনেক সড়কে যানজট বেড়েছে। বাস ও অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে একই সড়কে চলাচলের কারণে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। হঠাৎ মোড় নেওয়া, ফুটপাত দখল, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং বেপরোয়া গতিতে চলার কারণে পথচারীরাও ঝুঁকিতে পড়ছেন।
নতুন বিধিমালায় জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, উড়াল এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস চলাচলের সড়ক ও নির্ধারিত নিষিদ্ধ সড়কে ই-রিকশা চলাচলে বিধিনিষেধ রয়েছে। ফুটপাতেও এসব যান চলতে পারবে না। কিন্তু কোন সড়কে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে, কোথায় ই-রিকশা চলবে এবং কোথায় যাত্রী ওঠানামা করবে—এসব বিষয় মাঠপর্যায়ে স্পষ্ট না হলে অনিয়ম বন্ধ করা কঠিন হবে।
গাড়ির নিবন্ধন আগে, চালকের লাইসেন্স পরে
ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনায় আরেকটি দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে চালকের লাইসেন্সের বিষয়টি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিপুলসংখ্যক চালকের আবেদন একসঙ্গে প্রক্রিয়াকরণ কঠিন হওয়ায় প্রথমে যানবাহন নিবন্ধনের কাজ করা হবে। পরে পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চালকদের লাইসেন্সের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এতে শুরুতে নিবন্ধিত গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে চালকের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও পরিচয় যাচাই কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শুধু গাড়ির কারিগরি মান ঠিক করলেই সড়ক নিরাপদ হবে না। চালক ট্রাফিক আইন জানেন কি না, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে ই-রিকশার বিরুদ্ধে বেপরোয়া চালনা, উল্টো পথে চলাচল এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের অভিযোগ রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধানে চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের ব্যবস্থা পিছিয়ে রাখলে নিবন্ধন কার্যক্রমের সুফল সীমিত হতে পারে।
ফি নিয়ে আপত্তি, কাঠামো বদলাতে চান দুই বছর
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা। চার যাত্রীর ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা। বার্ষিক নবায়ন ফি যথাক্রমে চার হাজার ও পাঁচ হাজার টাকা। এর বাইরে ফিটনেস সনদের জন্য এক হাজার এবং নম্বর প্লেটের জন্য আরও এক হাজার টাকা দিতে হবে। নিবন্ধিত গাড়িতে কিউআর কোডযুক্ত নম্বর প্লেট ও তথ্যসংবলিত ব্লু-বুক দেওয়ার বিধান রয়েছে।
তবে একসঙ্গে এত টাকা জোগাড় করা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল অনেক চালক ও ক্ষুদ্র মালিকের জন্য কঠিন হতে পারে। নিবন্ধন ফি, নবায়ন, ফিটনেস এবং গাড়ির কাঠামো পরিবর্তনের খরচ মেটাতে না পারলে অনেকে নিবন্ধনের বাইরে থেকে যেতে পারেন। এতে অনিবন্ধিত যানবাহনের চলাচল বন্ধ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। ই-রিকশার জন্য বিধিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও এর কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ।
গত মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সংগঠনটি বিদ্যমান যানবাহনের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য অন্তত দুই বছর সময় দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি নিবন্ধন ও নবায়ন ফি কমানো, চালকের লাইসেন্সের বিধান যুক্ত করা এবং নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির নেতাদের বক্তব্য, কাঠামো পরিবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত সময় না দিলে বর্তমানে চলাচলরত অনেক গাড়ি নিবন্ধনের অযোগ্য হয়ে পড়বে। আবার চালকের লাইসেন্সের বিষয়টি পরে কার্যকর হলে পরিচয় যাচাইয়ে অনিয়ম, হয়রানি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বাড়তে পারে। কোন সড়কে ই-রিকশা চলবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এসব দাবিতে আগামী ১১ নভেম্বর দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে সমাবেশ ও স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি।
সংগঠনের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন বলেন, নিবন্ধন কার্যক্রমের সফলতা ফরম বিতরণ বা ফি আদায়ের ওপর নির্ভর করে না। কতটি গাড়ি চলাচলের অনুমতি পাচ্ছে, চালকেরা কতটা প্রশিক্ষিত, কোন সড়কে যানবাহন চলছে এবং বিধিমালা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কতটা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তার ওপরই এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন এসব বিষয় নিশ্চিত করতে না পারলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগই নতুন বিশৃঙ্খলার কারণ হতে পারে।
সরকারের লক্ষ্য যানবাহনকে নিয়মে আনা
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, ই-রিকশাকে বিধিমালার আওতায় এনে নিবন্ধন, চলাচলের রুট, সর্বোচ্চ গতি, যাত্রী ধারণক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে ও প্রধান বাস চলাচলের সড়কে এসব যান চলতে দেওয়া হবে না। সরকারের আশা, নিয়ম মেনে চলাচল নিশ্চিত করা গেলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে।
তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা নির্ধারণ, জোনভিত্তিক চলাচল, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা, নির্দিষ্ট পার্কিং এবং নিরাপদ চার্জিংব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অনিবন্ধিত যানবাহনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আইন প্রয়োগও জরুরি।
কালের আলো /এমএসএএকে/এমকে
