দীর্ঘদিনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় বন্ধ থাকা কক্সবাজারের এক হাজার ৪৬৬টি চিংড়ি মহালের কার্যক্রম আবার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব মহালের কার্যক্রম সচল করতে সংশ্লিষ্ট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে চিংড়ি মহালের কমিটি পুনর্গঠন, নতুন করে খাজনা নির্ধারণ এবং বকেয়া খাজনার ওপর জমা হওয়া সুদ সম্পূর্ণ মওকুফের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সচিবালয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু। প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
চিংড়ি চাষের উপযোগী জমি উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত
সভায় চিংড়ি চাষের উপযোগী যেসব জমিতে বন নেই, সেগুলোকে বন বিভাগের গেজেট থেকে বাদ দিয়ে চিংড়ি চাষের জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া বন, মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা এক লাখ ৯৫ হাজার একর জমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রাজস্ব আদায়ে ছাড় নয়, সমন্বিত ব্যবস্থাপনার তাগিদ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, চিংড়ি মহালের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। সরকারি রাজস্ব আদায়ে কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটানো যাবে না। কোনো লিজ নেওয়া জমি নিয়ে মামলা চলমান থাকলেও আইনি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকার রাজস্ব আদায় অব্যাহত রাখতে পারবে।
চিংড়ি চাষের উপযোগী খাসজমি দ্রুত বন্দোবস্ত দেওয়ার পাশাপাশি চিংড়ি মহাল কমিটিগুলো পুনর্গঠনের তাগিদ দেন তিনি। একই সঙ্গে উপকূলীয় বন সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আশির দশকে কক্সবাজারের চকোরিয়ায় সুন্দরবন নিধনের কারণে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি এড়াতে উপকূলীয় বনের সীমানা নির্ধারণ ও চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কমিটি পুনর্গঠন ও আইন সংশোধনের পরিকল্পনা
সভাপতির বক্তব্যে ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু বলেন, চিংড়ি খাতে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকলেও কয়েক দশকের প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতায় সরকার বিপুল রাজস্ব হারিয়েছে। একই সঙ্গে চাষিরাও নানা সমস্যায় পড়েছেন।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ভূমিমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু রাজস্ব বৃদ্ধি নয়; চিংড়ি খাতের ওপর নির্ভরশীল বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও স্বার্থ সুরক্ষাও নিশ্চিত করা।
বকেয়া খাজনার সুদ সম্পূর্ণ মওকুফ
সভা শেষে ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, চিংড়ি মহাল থেকে কার্যকরভাবে রাজস্ব আদায় এবং অতীতের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে সভায় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চিংড়ি ঘের ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মূল লক্ষ্য হলো কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই দেশের বঞ্চিত মানুষের কাছে স্বচ্ছভাবে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া। ভূমি মন্ত্রণালয়কে স্বচ্ছ ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতেও কাজ চলছে।
রিট মামলায় ১৪৬৬ মহালের কার্যক্রম বন্ধ
সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) দায়ের করা ৭৪৮৩/২০১২ নম্বর রিট মামলার কারণে কক্সবাজারের এক হাজার ৪৬৬টি চিংড়ি মহালের কার্যক্রম ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে। এসব মহালের কার্যক্রম পুনরায় চালু করতে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া ১৯৯২ সালের চিংড়ি মহাল কমিটি পুনর্গঠন এবং নতুন করে খাজনা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। দীর্ঘদিনের বকেয়া খাজনার ওপর জমা হওয়া সুদ সম্পূর্ণ মওকুফ করা হবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন যারা
সভায় ভূমি সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী, কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল, কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
