সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা পান করেই দিন শুরু করেন অনেকে। কারও পছন্দ দুধ চা, কেউ আবার স্বাস্থ্য সচেতনতার কথা ভেবে বেছে নেন গ্রিন টি, লেবু চা কিংবা হারবাল চা। তবে খালি পেটে চা পান করা শরীরের জন্য কতটা উপকারী, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
পুষ্টিবিদদের মতে, সকালে খালি পেটে চা পান করা ভালো না খারাপ—এর কোনো একক উত্তর নেই। বিষয়টি নির্ভর করে চায়ের ধরন, পান করার সময় এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর। কোনো চা পেটের অস্বস্তি কমাতে সহায়তা করতে পারে, আবার কোনোটি খালি পেটে পান করলে বমিভাব বা অ্যাসিডিটির সমস্যা তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ লরেন ম্যানেকারের মতে, খালি পেটে চা পান করলে কিছু উপকার পাওয়া সম্ভব। তবে চায়ের ধরন এবং ব্যক্তির হজমশক্তির ওপর নির্ভর করে এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
গ্রিন টি ও ব্ল্যাক টি খালি পেটে পান করা কতটা ভালো
ওজন নিয়ন্ত্রণ ও সুস্থ থাকার আশায় অনেকেই সকালে খালি পেটে গ্রিন টি পান করেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। গ্রিন টি ও ব্ল্যাক টি—দুটিতেই ক্যাফেইন রয়েছে। ফলে খালি পেটে পান করলে কারও কারও বমিভাব, বুকজ্বালা বা পেটে অস্বস্তি হতে পারে।
এই দুই ধরনের চায়ে পলিফেনল নামের উপকারী উদ্ভিজ্জ উপাদানও রয়েছে। তবে এই উপাদান খাবার থেকে আয়রন শোষণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ডাল, শাকসবজি, বাদাম ও শস্যজাতীয় খাবারে থাকা নন-হিম আয়রন শোষণ কমে যেতে পারে। মাংস, মাছ ও মুরগিতে থাকা হিম আয়রন শোষণেও কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে, যদিও তা তুলনামূলক কম।
তাই যাদের রক্তস্বল্পতা বা আয়রনের ঘাটতি রয়েছে, তাদের খাবারের সঙ্গে গ্রিন টি কিংবা ব্ল্যাক টি পান না করাই ভালো। খাবারের অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে বা পরে এসব চা পান করলে আয়রন শোষণে প্রভাব কমানো সম্ভব।
পেটের জন্য কোন হারবাল চা ভালো
খালি পেটে চা পান করতে চাইলে ক্যামোমাইল ও আদা দিয়ে তৈরি হারবাল চা তুলনামূলক ভালো বিকল্প হতে পারে। পুষ্টিবিদ লরেন ম্যানেকারের মতে, ক্যামোমাইল ও আদা চা পেটের অস্বস্তি কমাতে এবং হজমপ্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে। সাধারণত এসব চা তুলনামূলক কোমল হওয়ায় সকালে পান করলে অস্বস্তির আশঙ্কাও কম।
তবে আরেক পুষ্টিবিদ জেসিকা স্ট্রনের মতে, ক্যামোমাইল চা খালি পেটে পান করা যেতে পারে। অন্যদিকে, আদা চা খাবারের সঙ্গে পান করলে বেশি উপকার পাওয়া যেতে পারে। কারণ আদা পাকস্থলী থেকে খাবার অন্ত্রে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে এবং হজমে সহায়তা করতে পারে।
এ ছাড়া হিবিসকাস চা রক্তচাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। যাদের খাবার খাওয়ার পর রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তাদের জন্য এটি উপকারী হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ গ্রহণকারীদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই চাকে ওষুধের বিকল্প হিসেবে নেওয়া উচিত নয়।
পুদিনা চা খালি পেটে কিংবা খাবারের পর—দুই সময়ই পান করা যায়। তবে খাবারের পর পান করলে পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ওলং, মরিঙ্গা ও কম্বুচা পানের সময়
গ্রিন টি ও ব্ল্যাক টি ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের চায়ের ক্ষেত্রে পান করার সময় গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের সঙ্গে ওলং চা পান করলে ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
মরিঙ্গা বা সজনে পাতার চা আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করলে আয়রন শোষণে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে, কম্বুচায় থাকা প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক উপাদান অন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং হজমপ্রক্রিয়ার জন্য উপকারী হতে পারে। এ কারণে খাবারের সঙ্গে বা পরে কম্বুচা পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সকালে কোন চা বেছে নেবেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবার জন্য একই ধরনের চা কিংবা একই সময় নির্ধারণ করা ঠিক নয়। সকালে খালি পেটে চা পান করলে বমিভাব, বুকজ্বালা বা পেটে অস্বস্তি হলে আগে হালকা কিছু খেয়ে নেওয়া ভালো।
যাদের আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতা রয়েছে, তাদের খাবারের সঙ্গে গ্রিন টি ও ব্ল্যাক টি পান করা এড়িয়ে চলা উচিত। অন্যদিকে, ক্যামোমাইল চা সকালে খালি পেটে পান করার ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভালো বিকল্প হতে পারে।
সব মিলিয়ে, চা পানের উপকারিতা পেতে শুধু চায়ের ধরন নয়, কখন পান করছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় চা পানের অভ্যাস গড়ে তোলাই ভালো।
কালের আলো/এসএ/জেএন
