রাতে দেরি করে ঘুমাতে যাওয়া, সকালে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়েও ক্লান্তি না কাটা কিংবা সপ্তাহের একেক দিন একেক সময়ে ঘুমানো—এসব অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে। বিষণ্নতায় ভোগা মানুষের মধ্যেও ঘুমের এমন অনিয়ম দেখা যায়। এত দিন এসব সমস্যাকে বিষণ্নতার উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্ন সম্ভাবনা। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ির ছন্দে গোলমালই বিষণ্নতার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক বিষণ্নতার সম্ভাব্য এই ধরনকে ‘সারকাডিয়ান ডিপ্রেশন’ নামে চিহ্নিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের ধারণা, শরীরের ঘুম ও জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে বিষণ্নতার সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। তবে এটি এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত কোনো স্বতন্ত্র রোগের ধরন নয়।
শরীরের জৈবিক ঘড়ি কীভাবে কাজ করে
মানবদেহে একটি স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি রয়েছে, যা প্রায় ২৪ ঘণ্টার চক্রে কাজ করে। কখন ঘুম আসবে, কখন ঘুম ভাঙবে, দিনের কোন সময়ে শরীর বেশি সক্রিয় থাকবে—এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এই ঘড়ি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘সারকাডিয়ান রিদম’। সূর্যের আলো শরীরের এই ঘড়ির ছন্দ ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু নিয়মিত রাত জাগা, প্রতিদিন ভিন্ন সময়ে ঘুমানো কিংবা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমানোর কারণে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ঘুমের সমস্যা খুবই পরিচিত। তবে এত দিন মূলত মনে করা হতো, বিষণ্নতার কারণেই ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়। নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখছেন, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর উল্টো ঘটনাও ঘটতে পারে কি না। অর্থাৎ, শরীরের জৈবিক ঘড়ির ছন্দে গোলমাল বিষণ্নতার পেছনে ভূমিকা রাখছে কি না।
ঘুমের ছয় বৈশিষ্ট্যের মধ্যে তিনটি
‘ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি’তে প্রকাশিত গবেষণায় বিষণ্নতায় আক্রান্ত ১১ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা। এতে ঘুম ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছয়টি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে বছরের নির্দিষ্ট ঋতুতে বিষণ্নতার লক্ষণ বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, স্বাভাবিকের তুলনায় দেরিতে ঘুমাতে যাওয়া, রাতে জেগে থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করা, অতিরিক্ত ঘুমানো, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও ক্লান্তি অনুভব করা এবং কর্মদিবস ও ছুটির দিনে ঘুমানোর সময়ের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকা।
শেষের বৈশিষ্ট্যটিকে বলা হয় ‘সোশ্যাল জেট ল্যাগ’। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ কর্মদিবসে সকাল সাতটায় ঘুম থেকে ওঠেন, কিন্তু ছুটির দিনে ওঠেন বেলা ১১টায়। নিয়মিত এমন পার্থক্য শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের সময়সূচির অমিল তৈরি করতে পারে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যাঁদের এসব ছয়টি বৈশিষ্ট্যের অন্তত তিনটি ছিল, তাঁদের সম্ভাব্য সারকাডিয়ান ডিপ্রেশনের দলে রাখা হয়।
প্রতি চারজনের প্রায় একজনের মধ্যে বৈশিষ্ট্য
গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২ হাজার ৬০৪ জনের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ২৩ শতাংশের মধ্যে সম্ভাব্য সারকাডিয়ান ডিপ্রেশনের লক্ষণ ছিল। গবেষকেরা দেখতে পান, অন্যদের তুলনায় এই দলের মানুষের বিষণ্নতা অপেক্ষাকৃত কম বয়সে শুরু হয়েছে। তাঁদের বিষণ্নতার উপসর্গও তুলনামূলক বেশি গুরুতর ছিল।
জিনগত তথ্য বিশ্লেষণেও কিছু পার্থক্য পাওয়া গেছে। সম্ভাব্য সারকাডিয়ান ডিপ্রেশনের বৈশিষ্ট্য থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে মনোযোগের ঘাটতি ও অতিসক্রিয়তাজনিত সমস্যা (এডিএইচডি), বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁদের প্রত্যেকের এসব রোগ রয়েছে বা ভবিষ্যতে এসব রোগে আক্রান্ত হবেন। গবেষকেরা কেবল জিনগত ঝুঁকির সঙ্গে কিছু বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন।
প্রচলিত বিষণ্নতার ওষুধে কম সাড়া?
গবেষণায় আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে। সম্ভাব্য সারকাডিয়ান ডিপ্রেশনের বৈশিষ্ট্য থাকা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রচলিত কিছু বিষণ্নতার ওষুধে তাঁরা তুলনামূলক কম উপকার পেয়েছেন। পাশাপাশি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁদের বেশি ছিল। বিশেষ করে এসএসআরআই ও এসএনআরআই শ্রেণির অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধের ক্ষেত্রে এমন সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষণার অন্যতম লেখক সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যাকব ক্রাউসের মতে, বিষণ্নতা সবার ক্ষেত্রে একই রকম নয়। এর কারণ, উপসর্গ এবং চিকিৎসায় সাড়া দেওয়ার ধরনেও পার্থক্য থাকতে পারে। তাই রোগীদের মধ্যে এসব ভিন্নতা শনাক্ত করা জরুরি। তবে ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে তথ্য মূলত অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের দেওয়া অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে শুধু শরীরের জৈবিক ঘড়ির সমস্যার কারণেই ওষুধ কম কার্যকর হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
নতুন ধরনের বিষণ্নতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতভিন্নতা
গবেষকেরা সারকাডিয়ান ডিপ্রেশনকে বিষণ্নতার একটি সম্ভাব্য স্বতন্ত্র ধরন হিসেবে দেখার কথা বললেও এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এখনো মতভিন্নতা রয়েছে। লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডেভিড কার্টিসের মতে, গবেষণায় চিহ্নিত বৈশিষ্ট্যগুলো হয়তো এমন ব্যক্তিদের আলাদা করেছে, যাঁদের বিষণ্নতা আগে থেকেই বেশি গুরুতর। সে কারণেও তাঁদের ঘুমের সমস্যা এবং চিকিৎসায় তুলনামূলক কম সাড়া দেওয়ার প্রবণতা থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কলিন ম্যাকক্লাংও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কারও কারও বাইপোলার ডিজঅর্ডার থাকতে পারে। গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের ঘুমের অভ্যাস সম্পর্কে তথ্য নেওয়া হয়েছে তাঁদের নিজেদের বক্তব্যের ভিত্তিতে। শরীরে বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে ঘুমের সময় বা মেলাটোনিন হরমোনের মাত্রা পরিমাপ করে জৈবিক ঘড়ির সমস্যা নিশ্চিত করা হয়নি। এ ছাড়া গবেষণাটি থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, ঘুমের অনিয়মের কারণে বিষণ্নতা তৈরি হয়েছে, নাকি বিষণ্নতার কারণেই ঘুমের ছন্দে পরিবর্তন এসেছে।
ঘুমের সময় ঠিক করলে কি বিষণ্নতা কমবে?
শরীরের জৈবিক ঘড়ির ছন্দ ঠিক রাখতে আলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কারণে বিষণ্নতার চিকিৎসায় উজ্জ্বল আলো ব্যবহার করে ‘লাইট থেরাপি’ দেওয়ার পদ্ধতিও রয়েছে। ২০২৫ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঋতুভিত্তিক নয় এমন বিষণ্নতায় আক্রান্ত আট শতাধিক ব্যক্তির ওপর পরিচালিত বিভিন্ন পরীক্ষায় লাইট থেরাপি পাওয়া ব্যক্তিদের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষের উপসর্গ এতটাই কমেছে যে তাঁরা রোগমুক্তির নির্ধারিত মানদণ্ডে পৌঁছেছেন। তুলনায় নিয়ন্ত্রণ দলের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ।
তবে এসব গবেষণায় বিশেষভাবে সম্ভাব্য সারকাডিয়ান ডিপ্রেশনের বৈশিষ্ট্য থাকা ব্যক্তিদের বেছে নেওয়া হয়নি। ফলে এই নির্দিষ্ট দলের মানুষের ক্ষেত্রে লাইট থেরাপি বেশি কার্যকর হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ ছাড়া শরীরের ঘুম-জাগরণের চক্র নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা মেলাটোনিন হরমোন নিয়েও গবেষণা চলছে। বিষণ্নতার চিকিৎসায় মেলাটোনিন ব্যবহারের উপকারিতা সম্পর্কে এখনো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সম্ভাব্য সারকাডিয়ান ডিপ্রেশনের বৈশিষ্ট্য থাকা তরুণদের ক্ষেত্রে মেলাটোনিন কতটা কার্যকর, তা পরীক্ষা করছেন।
রাত জাগলেই কি বিষণ্নতার ঝুঁকি?
রাতে দেরি করে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস থাকলেই কারও বিষণ্নতা রয়েছে বা ভবিষ্যতে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হবেন, এমন নয়। একইভাবে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ক্লান্তি কিংবা ছুটির দিনে বেশি ঘুমানোর অর্থও বিষণ্নতা নয়। গবেষণাটি মূলত আগে থেকেই বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ঘুমের কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে রোগের তীব্রতা ও চিকিৎসার সম্পর্ক খুঁজেছে। সাধারণ মানুষের বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নির্ধারণ করেনি।
তবে নিয়মিত ঘুমের সমস্যা হলে, বিশেষ করে দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, আগের পছন্দের কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিষণ্নতার চিকিৎসা চললে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করা কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মেলাটোনিন বা লাইট থেরাপি শুরু করা উচিত নয়।
গবেষণাটি বিষণ্নতার কারণ ও চিকিৎসা নিয়ে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। ভবিষ্যতে ঘুমের ধরন ও শরীরের জৈবিক ঘড়ির ছন্দ বিবেচনায় নিয়ে বিষণ্নতার চিকিৎসা আরও নির্দিষ্ট করা সম্ভব হতে পারে। তবে সারকাডিয়ান ডিপ্রেশনকে স্বতন্ত্র ধরন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
কালের আলো/এসএ/এসএআর
