পুলিশের কর্মজীবনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অভিজ্ঞতা, মাঠপর্যায়ের পুলিশিং থেকে প্রশাসনিক নেতৃত্ব—বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার পথ পেরিয়ে এবার স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) নেতৃত্বে মো. ফারুক আহমেদ। তাঁর সামনে এখন নতুন দায়িত্বের পাশাপাশি নতুন প্রত্যাশাও। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পেশাদারত্ব প্রতিষ্ঠা এবং একটি আদর্শ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসআরবিকে গড়ে তোলাই হবে তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম পরীক্ষা।
রোববার (৮ নভেম্বর) সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এসআরবির মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. ফারুক আহমেদ। দায়িত্ব নেওয়ার পর এসআরবি সদরদপ্তরের শহীদ লে. কর্নেল আজাদ মেমোরিয়াল হলে আয়োজিত স্বাগত দরবারে অংশ নেন তিনি।
- প্রকৌশল শিক্ষার্থী থেকে অতিরিক্ত আইজিপি, প্রায় তিন দশকের কর্মজীবনে মাঠপর্যায়ের পুলিশিং, জাতিসংঘ মিশন ও প্রশাসনিক দায়িত্বের অভিজ্ঞতা
- হাইওয়ে পুলিশের পর এবার স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক, প্রথম দিনেই দিলেন পেশাদারত্ব ও জবাবদিহির বার্তা
সেখানে বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ফারুক আহমেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন—দায়িত্ব পালনে শুধু পেশাদারত্ব নয়, থাকতে হবে আন্তরিকতা ও জবাবদিহিও। জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন তিনি।
বাংলাদেশের জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এসআরবিকে একটি আদর্শ ও রোল মডেল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ারও নির্দেশনা দেন নবনিযুক্ত মহাপরিচালক।
দায়িত্ব বদলে প্রত্যাশার নতুন অধ্যায়
গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে হাইওয়ে পুলিশ থেকে বদলি করে ফারুক আহমেদকে এসআরবির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। তিনি সদ্য সাবেক মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশের স্থলাভিষিক্ত হলেন।
এই দায়িত্ব পরিবর্তনকে তাঁর দীর্ঘ পুলিশি ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা থেকে শুরু করে পুলিশের প্রশাসনিক ও পরিচালনাগত দায়িত্ব—বিভিন্ন স্তরে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
প্রকৌশল শিক্ষার্থী থেকে পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা
একজন প্রকৌশল শিক্ষার্থী থেকে পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ কর্মজীবন, বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্ব এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়।
বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার কৈডালা (রণবাঘা) গ্রামের সন্তান ফারুক আহমেদ রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৭তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের মাধ্যমে ১৯৯৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন।

প্রকৌশল বিদ্যার শিক্ষাগত পটভূমি নিয়ে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশিং, প্রশাসন ও নেতৃত্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে আন্তর্জাতিক পরিসর
প্রায় তিন দশকের কর্মজীবনে ফারুক আহমেদ পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
জেলা পুলিশে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি লাইবেরিয়া ও দারফুরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পেশাগত প্রশিক্ষণ ও সেমিনারে অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক পুলিশিং সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
এই অভিজ্ঞতার একটি বিশেষ দিক হলো, তাঁর কর্মজীবনে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা—দুই ক্ষেত্রেই কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি একটি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ সম্পর্কেও তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।
পদোন্নতির অপেক্ষা পেরিয়ে নেতৃত্বের শীর্ষে
ফারুক আহমেদের কর্মজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত থাকার অধ্যায়। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় পুলিশ সুপার পদে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে তাঁকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে পদোন্নতি ও রদবদলের ধারায় তিনি ডিআইজি পদে পদোন্নতি পান। এরপর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (অ্যাডমিন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তী সময়ে তাঁকে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে বদলি করা হয়। সেখানে প্রশাসনিক ও পরিচালনাগত দায়িত্ব পালনের পর গত ৪ জুন বর্তমান সরকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাঁকে আরও চারজন ডিআইজির সঙ্গে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত আইজিপি করে। এরপর জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে দায়িত্ব পান হাইওয়ে পুলিশের প্রধান হিসেবে। সেই দায়িত্ব থেকে এবার তাঁকে নিয়ে আসা হলো স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের শীর্ষ নেতৃত্বে।
বিশাল গুরুদায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে
মো. ফারুক আহমেদের নতুন দায়িত্বের গুরুত্ব কেবল একটি বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জননিরাপত্তা, আইনের শাসন, পেশাদার আচরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি—এসব বিষয়কে সামনে রেখে এসআরবির কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও জনআস্থার উপযোগী করে তোলার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে একটি বিশেষায়িত বাহিনীর ক্ষেত্রে দক্ষতা, শৃঙ্খলা, নিয়মতান্ত্রিকতা এবং জবাবদিহির সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন মহাপরিচালক দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই তাঁর বক্তব্যে এসব বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
দীর্ঘ পুলিশি অভিজ্ঞতা, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাঁর নেতৃত্বের শক্তি হতে পারে। তবে সেই অভিজ্ঞতাকে কতটা কার্যকরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, দক্ষতা ও জনআস্থায় রূপান্তর করতে পারেন, সেটিই হবে নতুন দায়িত্বে তাঁর নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্যায়নের জায়গা। পুলিশের দীর্ঘ পথচলায় ফারুক আহমেদের সামনে এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্যক্তিগত কর্মজীবনের নতুন উচ্চতার পাশাপাশি এসআরবিকে একটি আদর্শ ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার গুরুদায়িত্বও এখন তাঁর কাঁধে।
কালের আলো/এমএএএমকে
