ইরানের কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সামান্য বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়া এবং অঞ্চলটি থেকে দীর্ঘ সময় তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সোমবারের (২ নভেম্বর) বড় দরপতনের পর মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) তেলের দাম বাড়লেও ঊর্ধ্বগতির পরিমাণ ছিল সীমিত।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) স্থানীয় সময় রাত ৩টা ৫৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ বেড়ে ৯৬ ডলার ৬৬ সেন্টে দাঁড়ায়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ সেন্ট বা শূন্য দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলার ৮০ সেন্টে পৌঁছায়।
সোমবার (২ নভেম্বর) বড় দরপতনের পর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
এর আগে সোমবার (২ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক বাজারে ডব্লিউটিআই ও ব্রেন্ট—উভয় মানদণ্ডের তেলের দাম ৭ শতাংশের বেশি কমেছিল। ইরান ও কাতারের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাজারে স্বস্তি ফিরে আসে। এর প্রভাবেই সোমবার তেলের দামে বড় পতন দেখা যায়।
তবে মঙ্গলবার ইরানের কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার খবর প্রকাশের পর সেই স্বস্তি অনেকটাই কমে যায়। নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলার খবর
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দেশটির কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানায়, ইরানের কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের কয়েকজন এ অভিযানকে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরান যাতে অবাধ সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করতেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
হামলার খবর প্রকাশের পর তেলের বাজারে নতুন করে ঝুঁকির হিসাব শুরু হয়। কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, এ প্রতিবেদন তেলের দামে নতুন করে কিছুটা ঝুঁকিজনিত মূল্য সংযোজন করেছে। বাজার যখন কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিল, তখন সামরিক তৎপরতার খবর পরিস্থিতির চিত্র বদলে দিয়েছে।
বড় দরবৃদ্ধির পথে বাধা সরবরাহ পরিস্থিতি
তবে হামলার খবরের পরও তেলের দাম বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটাতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রভাব ইতোমধ্যে অনেকটাই প্রতিফলিত হয়েছে।
ফিলিপ নোভার বাজার বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান প্রিয়াঙ্কা সচদেবার মতে, সরাসরি জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির সুস্পষ্ট প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত শুধু সামরিক তৎপরতার খবরের ভিত্তিতে তেলের বাজারে দীর্ঘস্থায়ী দরবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাজার এখন শুধু সংঘাতের খবর নয়, বরং বাস্তবে তেল সরবরাহ কতটা ব্যাহত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে।
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যোগাযোগ অব্যাহত
এদিকে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে সোমবার জানিয়েছে তেহরান। এর আগে কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে ইরানের কয়েক দিন ধরে চলা আলোচনা শেষ হলেও কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছানো যায়নি। আলোচনায় উভয় পক্ষের প্রস্তাবে কিছু পরিবর্তন এলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
অন্যদিকে, ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর বিষয়ে আগের হুমকি কার্যকর করা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি। ফলে সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনো খোলা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমেছে
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও সরবরাহব্যবস্থায় আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রেও বাড়ছে জ্বালানির দামের চাপ
ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারেও। দেশটিতে পেট্রোলের উচ্চমূল্যের পেছনে এই সংঘাতকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জ্বালানির বাড়তি দাম সাধারণ মার্কিন ভোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করায় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কায় অক্টোবরের শেষ দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছিল। বিশেষ করে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এ অঞ্চলে সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে—এমন আশঙ্কাও তেলের বাজারে প্রভাব ফেলেছে।
শান্তি আলোচনায় বিশেষ ক্ষমতা পেয়েছেন সরকার
অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতাবা খামেনি শান্তি আলোচনার জন্য সরকারকে বিশেষ কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে একদিকে সামরিক উত্তেজনা, অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগ—এই দুই বিপরীতমুখী পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার। ফলে আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গতিপ্রকৃতি এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিই তেলের দামের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বাজার বিশ্লেষকদের বক্তব্য
কালের আলো/এসএ/এমএসআইপি
