শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধিতা করে জার্মানির ৩০টির বেশি শহরে বিক্ষোভ করেছেন তরুণেরা। শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ু সুরক্ষা এবং মৌলিক অধিকার রক্ষার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশজুড়ে এ কর্মসূচি পালিত হয়। তবে ইউরোপের কয়েকটি দেশের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের মতো জার্মানির কর্মসূচিতে সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। ‘জেন জি রেগেল্ট’ নামের একটি সংগঠনের ডাকে রাজধানী বার্লিন, হামবুর্গ, মিউনিখ, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও কোলনসহ বিভিন্ন শহরে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এতে তরুণদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশ নেন। আয়োজকদের প্রত্যাশা ছিল, দেশজুড়ে বিক্ষোভে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেবেন। তবে বিভিন্ন শহরে উপস্থিতির সংখ্যা সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি
আন্দোলনকারীদের ছয় দফা দাবির মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো। পাশাপাশি স্কুলের ভবন ও অবকাঠামো সংস্কার, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং আরও শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। শিক্ষার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও মনোচিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে বিক্ষোভে। সামাজিক খাতে ব্যয় সংকোচন বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিও তুলেছেন আন্দোলনকারীরা।
এ ছাড়া বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধিতা, জলবায়ু সুরক্ষা এবং মৌলিক অধিকার রক্ষার বিষয়গুলোও তাঁদের দাবির তালিকায় রয়েছে। আয়োজকদের মতে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। আন্দোলনের মুখপাত্র এমা হুবনার বলেন, তরুণেরা চান তাঁদের বক্তব্য ও দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হোক। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের চিত্র
জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম জেডডিএফের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বাণিজ্যিক শহর ফ্রাঙ্কফুর্টে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। পুলিশের হিসাবে, আয়োজকদের প্রত্যাশার তুলনায় উপস্থিতি কম হলেও কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল ছিল। দক্ষিণের শহর মিউনিখে দুপুরের দিকে প্রায় ১ হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হন। অন্যদিকে কোলনে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। সেখানে ১৫ হাজার মানুষের সমাবেশের অনুমতি থাকলেও বাস্তবে সেই সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়নি।
রাজধানী বার্লিনে ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনে বিক্ষোভে তরুণদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের মানুষ যোগ দেন। হামবুর্গেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণের উপস্থিতি ছিল। জার্মানির বার্লিন ও হামবুর্গে বসবাসরত বাংলাদেশিরা জানান, বার্লিনে বিক্ষোভে মানুষের উপস্থিতি মোটামুটি থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে পরিমাণ অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তা দেখা যায়নি। তবে হামবুর্গে তরুণদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি ছিল। এ সময় হামবুর্গের অনেক তরুণ চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎসকে লক্ষ্য করে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান দেন।
বামপন্থীদের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক
জার্মানির এই বিক্ষোভকে ঘিরে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনার পর জার্মানিতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। বামপন্থী দল ও সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়েও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিক্ষোভে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী ধারার কিছু সংগঠন এবং অ্যান্টিফা গোষ্ঠীর সদস্যদের উপস্থিতি দেখা গেছে।
তবে আন্দোলনের আয়োজকেরা এই অভিযোগের বিপরীতে বলেছেন, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সবাইকে উগ্রপন্থী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তাঁদের মতে, বিভিন্ন মত ও পথের মানুষ নিজেদের দাবি ও উদ্দেশ্য সামনে নিয়ে এমন কর্মসূচিতে যুক্ত হতে পারেন। সব মিলিয়ে শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সামরিক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জার্মানির তরুণদের অসন্তোষ এই বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে। আন্দোলনকারীরা চাইছেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁদের ভবিষ্যৎ ও প্রয়োজনীয়তাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হোক।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি
