রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের অবসান হলে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপের ১০টি দেশ। এ লক্ষ্যে পোল্যান্ডে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ সেনা। আগামী ৯ থেকে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এ মহড়া। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এ তথ্য জানিয়েছে। খবর ইউরো নিউজের।
‘কোয়ালিৎসজা’ নামের এ সামরিক মহড়ার নেতৃত্ব দেবে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য। পোলিশ ভাষায় ‘কোয়ালিৎসজা’ শব্দের অর্থ জোট। ২০২৫ সালে গঠিত ইউক্রেনের জন্য বহুজাতিক বাহিনী (এমএনএফ-ইউ)-এর এটিই প্রথম বড় ধরনের সামরিক মহড়া। রাশিয়ার ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধের অবসানে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলে তবেই বাহিনীটি ইউক্রেনে মোতায়েন করা হবে।
স্থল, নৌ ও আকাশপথে মোতায়েনের সক্ষমতা যাচাই
ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, স্থল, নৌ ও আকাশপথ ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের সেনাদের কত দ্রুত এবং দক্ষতার সঙ্গে ইউক্রেনে সহায়তার জন্য মোতায়েন করা যায়, তা যাচাই করা হবে এই মহড়ায়।
বহুজাতিক বাহিনীটির প্যারিসে ইতোমধ্যে একটি কার্যকর সদর দপ্তর রয়েছে। এটি ন্যাটোর কোনো অভিযান নয়। এ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাও সীমিত। বাহিনীটির মূল লক্ষ্য ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তা করা, দেশটির আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষ্ণসাগরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় চালু করতে সহযোগিতা দেওয়া। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেন, ‘এটি কোনো কাল্পনিক পরিকল্পনা নয়, বরং একটি বাস্তব বাহিনী। যুদ্ধ বন্ধ হলে ইউক্রেনকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকবে তারা।’
অংশ নিচ্ছে ইউরোপের ১০ দেশ
পোল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ইউক্রেন সীমান্তের কাছাকাছি নোভা ডেম্বা শহরের আশপাশে স্থল ও আকাশপথের মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। এতে বেলজিয়াম, এস্তোনিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, স্পেন, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যের সেনারা অংশ নেবেন।
মহড়ায় সবচেয়ে বড় সেনাদল পাঠাচ্ছে ফ্রান্স। দেশটি ১ হাজার ১০০ সেনা পাঠাবে। আর যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণ থাকবে ৩০০ সেনার। মহড়ার সহনেতৃত্ব দেবেন ফরাসি জেনারেল আরমেল দিরু ও ব্রিটিশ লেফটেন্যান্ট জেনারেল টম বেটম্যান। ফরাসি জেনারেল দিরু বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই ইউক্রেনে বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েনের সক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে এ মহড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কৃষ্ণসাগরে আলাদা মহড়ার নেতৃত্ব দেবে তুরস্ক
ইউক্রেনের নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কৃষ্ণসাগরেও সামরিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে মাইন অপসারণ অভিযানের সক্ষমতা যাচাই করতে ইস্তাম্বুল থেকে একটি সামুদ্রিক মহড়ার নেতৃত্ব দেবে তুরস্ক। তবে পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য স্থল মহড়ায় তুরস্কের সেনারা অংশ নেবেন না।
শান্তিরক্ষী বাহিনী নয়, লক্ষ্য ইউক্রেনের সক্ষমতা বাড়ানো
ব্রিটিশ জেনারেল টম বেটম্যান স্পষ্ট করেছেন, ইউক্রেনের জন্য গঠিত বহুজাতিক বাহিনী কোনো শান্তিরক্ষী বাহিনী নয়। এটি যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের মিশন হিসেবেও কাজ করবে না। একই সঙ্গে বাহিনীটি আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনার জন্য গঠন করা হয়নি।
তাঁর মতে, বাহিনীটির প্রধান উদ্দেশ্য ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীকে পুনর্গঠনে সহায়তা করা এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসন প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনে তা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে পারবে ইউক্রেন।
ভারী অস্ত্র নয়, ড্রোন মোকাবিলায় গুরুত্ব
পোল্যান্ডের মহড়ায় ভারী অস্ত্রের পরিবর্তে ড্রোনের মতো হালকা সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে। আকাশ থেকে আসা ড্রোন মোকাবিলা এবং আত্মরক্ষার কৌশলও অনুশীলন করা হবে। মহড়ায় কোনো ট্যাংক মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই।
জেনারেল বেটম্যান জানান, বিভিন্ন দেশের সেনাদের মধ্যে সমন্বয়, সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন, রসদ সরবরাহ এবং বহুজাতিক বাহিনীর বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, তা যাচাই করা হবে।
ফরাসি জেনারেল দিরুর মতে, বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সম্ভাব্য লজিস্টিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য কাটিয়ে কীভাবে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা যায়, সেটিই এ মহড়ার অন্যতম উদ্দেশ্য। এটি শক্তি প্রদর্শনের কোনো আয়োজন নয়।
রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ
এদিকে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের অবসান নিয়ে মস্কোর আগ্রহ এখনো স্পষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনে ইউরোপীয় সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি এবং পোল্যান্ডে বড় পরিসরে সামরিক মহড়া রাশিয়ার বিরক্তির কারণ হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি হলে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইউরোপের এই বহুজাতিক বাহিনী কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সামরিক সমন্বয় ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। সূত্র: ইউরো নিউজ
কালের আলো/এসএ/টিসি
