মাঠে ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু বাজারে মিলছে না ন্যায্য দাম। উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম দামে ফুলকপি ও বাঁধাকপি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকেরা। অন্যদিকে কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে কেনা এসব সবজি খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে তিন থেকে চার গুণ বেশি দামে। ফলে ভালো ফলনও কৃষকদের জন্য স্বস্তির বদলে লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপি তোলার মৌসুম চলছে। পাইকারি বাজারে এক মণ (৪৩ কেজি) কপির দাম পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪০০ টাকা। সে হিসাবে প্রতি কেজির দাম পড়ে প্রায় ৯ টাকা ৩০ পয়সা। অথচ কৃষকদের দাবি, খুচরা বাজারে একই সবজি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে। উৎপাদক ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের এই বিশাল ব্যবধানের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকেরা।
উৎপাদন খরচের চেয়েও কম আয়ের আশঙ্কা
সদর উপজেলার বেগুনবাড়ি এলাকার কৃষক মনসুর আলী এবার দুই বিঘা জমিতে ফুলকপির আবাদ করেছেন। জমি তৈরি থেকে শুরু করে ফসল উৎপাদন পর্যন্ত তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে সবজি বিক্রি করে তাঁর আয় ৮০ হাজার টাকার বেশি হবে না বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। অর্থাৎ ফসল বিক্রি করেও উৎপাদন খরচের পুরো টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। মনসুর আলী বলেন, ‘আমরা মাঠে ফসল ফলাই, কিন্তু দাম নির্ধারণের সময় আমাদের কোনো হাত থাকে না। মণপ্রতি ৪০০ টাকা পেলে শ্রমিক খরচই ওঠে না।’
চারা, সার, সেচ ও শ্রমিকের খরচে বিপাকে
একই এলাকার কৃষক শাহাবুদ্দিন জানান, এক বিঘা জমিতে ফুলকপি বা বাঁধাকপির জন্য ১০ থেকে ১২ হাজার চারা লাগাতে হয়। শুধু চারা কিনতেই খরচ পড়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা। এরপর পাঁচবার সার প্রয়োগ, চারবার নিড়ানি এবং অন্তত ১০ বার সেচ দিতে হয়। রোগবালাই দমনেও বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়।
ফসল তোলার সময় প্রতিদিন ৫০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক নিতে হচ্ছে। কিন্তু বাজারে দাম না থাকায় ফসল কাটার সিদ্ধান্ত নিতেও হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। উৎপাদনের পেছনে এত ব্যয় করার পরও বিক্রির সময় ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হতাশ এই কৃষক।
বাজারে ক্রেতা নেই, জমিতেই পড়ে থাকছে ফসল
হরিপুর উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম আড়াই বিঘা জমিতে বাঁধাকপির চাষ করেছেন। কিন্তু বাজারে ক্রেতা না থাকায় তিনি ফসল বিক্রি করতে পারছেন না। একই পরিস্থিতি বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার দুওসুও এলাকার কৃষক আকতারুজ্জামানেরও। উৎপাদন উপকরণের দাম বাড়ায় তাঁদের চাষাবাদের খরচ বেড়েছে। অথচ উৎপাদিত সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে কম দামে।
সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা
কৃষকদের মতে, ফুলকপি ও বাঁধাকপির দাম কমে যাওয়ার পেছনে শুধু অতিরিক্ত উৎপাদনই দায়ী নয়; কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের দুর্বল ব্যবস্থাও বড় কারণ। স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প না থাকায় মৌসুমে একসঙ্গে উৎপাদিত সবজি দ্রুত বাজারে বিক্রি করতে হয়।
ফুলকপি ও বাঁধাকপি পচনশীল হওয়ায় দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করার সুযোগ নেই। ফলে বাজারে দাম কম থাকলেও কৃষকদের অপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না। বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি করতে হয় তাঁদের। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি কপি ১৫ থেকে ২০ টাকা দরে বিক্রির সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে লোকসানের চাপ কিছুটা কমবে। পাশাপাশি সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে কৃষকেরা মৌসুমের শুরুতেই কম দামে সবজি বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।
সরবরাহ বাড়ায় কমেছে দাম: কৃষি বিভাগ
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, এবার অনুকূল আবহাওয়ার কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আগাম বাঁধাকপি ও ফুলকপির চাষ হয়েছে। একসঙ্গে বেশি পরিমাণ সবজি বাজারে আসায় দাম কমেছে। তবে এ পরিস্থিতি সাময়িক বলে মনে করেন তিনি। তাঁর আশা, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এবং শীত বাড়লে ফুলকপি ও বাঁধাকপির দাম বাড়তে পারে।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি
