সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের ওপর হামলা, সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত ও মারধর এবং চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে কর্মবিরতির ঘটনা যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে হাসপাতালটিতে এমন একাধিক ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দৃশ্যমান নজির নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ গত ২৮ অক্টোবর রোগীর স্বজনদের ওপর হামলার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক আক্রান্ত হন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে রোগীর স্বজনদের ওপর হামলা, সংঘর্ষ এবং সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটেছে। কখনো হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর সর্বশেষ হামলা
গত ২৮ অক্টোবর ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের মারধরের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন দৈনিক শ্যামল সিলেটের ফটোসাংবাদিক রেজা রুবেল এবং সিলেটভিউ২৪ডটকমের স্টাফ রিপোর্টার নিবেন্দু তালুকদার। এ ঘটনায় দুই সাংবাদিক আহত হন।
ঘটনার পর চিকিৎসাসেবা বন্ধ রেখে শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। ৩১ অক্টোবর সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
চলতি বছরেও একাধিক সংঘর্ষ
চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি হাসপাতালের চতুর্থ তলার সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসক, নার্স ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হন। এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসককে হেনস্তার অভিযোগও ওঠে। পরে রোগীর তিন স্বজনকে আটক করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।
এর পরদিন ১৭ জানুয়ারিও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও স্টাফদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের তর্ক-বিতর্কের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করেন। ওয়ার্ডের ভেতরে ভাঙচুর এবং এক নারী শিক্ষানবিশ চিকিৎসককে হেনস্তার অভিযোগও তোলেন চিকিৎসকরা।
গত ৮ জুলাই হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কয়েক দফা মারামারির ঘটনা ঘটে। পরে এ ঘটনায় অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ঘোষণা করা হয়। ইন্টার্ন ডক্টরস ফোরাম রোগীর স্বজনদের হামলায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়।
আগের ঘটনাগুলোরও বিচার নিয়ে প্রশ্ন
গত বছরের ২৭ এপ্রিল হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে এক রোগীর স্বজনকে লাথি মারার অভিযোগ ওঠে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্ত চিকিৎসক তন্ময় দেবনাথকে দায়িত্ব থেকে বিরত রেখে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
২০২৪ সালের ২১ মার্চ এক প্রবীণ রোগীকে চিকিৎসকরা মারধর করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় এক নারী চিকিৎসক হাসপাতালের পরিচালকের কাছে অভিযোগ করেন।
২০২৩ সালের ২১ আগস্ট হাসপাতালের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। রোগীর স্বজনদের ওপর ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হামলার অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে ক্ষুব্ধ স্বজনদের বিরুদ্ধে ভাঙচুরের অভিযোগ করেন চিকিৎসকরা। পরে রোগীর চার স্বজনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
কর্মবিরতিতে ভোগান্তিতে রোগীরা
২০২২ সালের ৩ আগস্ট শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলে কর্মবিরতি শুরু করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। তাদের অভিযোগ ছিল, কয়েকজন দুর্বৃত্ত কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে এবং এক নারী শিক্ষানবিশ চিকিৎসককে হয়রানি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়া হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের পাশাপাশি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবাও বন্ধ রাখেন তারা। সেদিন হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়াকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাও ঘটে।
একই বছরের ১২ আগস্ট হাসপাতালের চতুর্থ তলার ১ নম্বর ওয়ার্ডে রোগীর এক স্বজন রুবেনা বেগম (২৭) মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে।
বছরের পর বছর একই অভিযোগ
২০২১ সালের নভেম্বরেও এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। গুরুতর অসুস্থ শ্বশুরকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসা শুরুতে বিলম্ব হওয়ায় ওই সাংবাদিক হাসপাতালের উপপরিচালকের কাছে ফোনে অভিযোগ করেন। বিষয়টি জানতে পেরে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাঁর ওপর চড়াও হন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে অন্য সাংবাদিকরা গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করেন।
২০১৯ সালের ১২ মার্চ হাসপাতালে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে রোগীর দুই স্বজনকে মারধর করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের নির্দেশে কর্মরত আনসার সদস্যরা তাঁদের মারধর করেন। পরে জনসমক্ষে কান ধরে ওঠবস করানো হয়। আহত ব্যক্তিরা যাতে অভিযোগ না করেন, সে জন্য তাঁদের কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রোগী দেখতে হাসপাতালে প্রবেশের সময় নিরাপত্তাকর্মীদের টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বচসা ও হামলার ঘটনা ঘটে। এতে রোগীর দুই স্বজন আহত হন।
তদন্ত কমিটি হলেও শাস্তির নজির কোথায়?
এসব ঘটনার কয়েকটিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কোথাও অভিযুক্ত চিকিৎসককে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে, কোথাও মামলা হয়েছে, আবার কোনো ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে আদালতে পাঠিয়েছে। তবে তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন কিংবা বিভাগীয় শাস্তির দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এমনকি ২০০৮ সালেও ওসমানী হাসপাতালে কয়েকজন ফটোসাংবাদিক ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হামলার শিকার হয়েছিলেন। সে সময় সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা দুঃখ প্রকাশ করেন এবং আপসের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেন। দীর্ঘ সময় পর ২০২৬ সালে আবারও সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে।
নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, তেমনি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। কিন্তু একই হাসপাতালে বারবার হামলা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সংঘর্ষ এবং চিকিৎসাসেবা বন্ধের ঘটনায় সাধারণ রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন।
এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা এবং হাসপাতালের নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. আবু জাফর মো. খালেদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
