Kaler Alo
সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬
১৭ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

রংপুর সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

দুই হাত নেই তবু দমেনি কলির স্বপ্নযাত্রা

রংপুর সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

দুই হাত নেই তবু দমেনি কলির স্বপ্নযাত্রা

জন্ম থেকেই দুই হাতের কবজি নেই। ছোটবেলায় হারিয়েছেন বাবাকেও। সংসারে অভাব-অনটন, চলাফেরায় শারীরিক সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে জীবনটা ছিল নানা প্রতিকূলতায় ঘেরা। কিন্তু কোনো বাধাই দমাতে পারেনি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার কলি রানীর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে। দুই হাতের পরিবর্তে ডান পা দিয়ে লিখেই একের পর এক শিক্ষার ধাপ পেরিয়ে এবার উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় জিপিএ ৩ দশমিক ৫০ পেয়েছেন তিনি। তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হওয়া, স্বপ্ন একজন ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে মানুষের সেবা করা। ১৮ বছর বয়সী কলি রানী চলতি বছর কাউনিয়া কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। পা দিয়ে লিখে পাওয়া এই সাফল্যে আনন্দিত তাঁর পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসী।

বাবাকে হারিয়ে শুরু হয় সংগ্রামের পথচলা

কলি রানী কাউনিয়া উপজেলার হরিশ্বর গ্রামের প্রয়াত মনোরঞ্জন রায়ের মেয়ে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। জন্মগতভাবে তাঁর দুই হাতের কবজি নেই। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারানোর পর সংসারে নেমে আসে আরও কঠিন সময়। অভাব-অনটনের মধ্যেও মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি মা রুপালী রানী। কলির পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে বড় ভাই মন্টু রাম রায় তাঁকে স্কুলে ভর্তি করান। এরপর ডান পা দিয়ে লিখে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও এসএসসি পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন তিনি।

পা দিয়েই পরীক্ষা, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ

কলি রানীর মা রুপালী রানী বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁর মেয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও অভাব-অনটন কোনো কিছুই তার পড়াশোনার ইচ্ছাকে দমাতে পারেনি। বড় ভাই মন্টু রাম রায় বলেন, কলি রানীর স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা করা। এ জন্য পরিবারের পাশাপাশি রাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি নিজেও অভাবের সংসার চালাতে কখনো দিনমজুরি করেন, আবার কখনো নিজের সামান্য জমিতে চাষাবাদ করেন।

পড়াশোনার বাইরেও কলি রানীর রয়েছে নানা প্রতিভা। ডান পা দিয়েই তিনি মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার পরিচালনা করতে পারেন। গানের প্রতিও রয়েছে তাঁর বিশেষ আগ্রহ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে পেয়েছেন পুরস্কার ও প্রশংসা।

সবার সঙ্গে বসেই পরীক্ষা দেওয়ার ইচ্ছা

কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব রফিকুল ইসলাম জানান, বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা থাকলেও কলি রানী সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে পরীক্ষা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী ৩০২ নম্বর কক্ষে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে প্রতিটি পরীক্ষা সম্পন্ন করে তিনি সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। কাউনিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ফারুক আজম বলেন, কলি রানী পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৩ দশমিক ৫০ পেয়েছেন। তাঁর এই সাফল্যে কলেজ কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। এর আগেও তিনি পা দিয়ে লিখে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও এসএসসি পরীক্ষায় সফল হয়েছেন।

স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার

কলি রানী বলেন, ‘এখন আমার স্বপ্ন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিসিএস ক্যাডার হওয়া। তবে সেই স্বপ্ন পূরণে পরিবারের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রয়োজন। মানুষের সব বাধা-বিপত্তিকে পেছনে ফেলে আমি আমার ইচ্ছাশক্তি দিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি। আমার ইচ্ছে, আমি বিসিএসে পাস করে ম্যাজিস্ট্রেট হতে চাই। আর আমাকে দেখে যেন প্রতিবন্ধীরা সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে পারে।’ বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনছার আলী বলেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে সবকিছু জয় করা যায়, কলি রানী তার প্রমাণ দিয়েছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন তিনি। তাঁর স্বপ্ন পূরণ হোক, সেই প্রত্যাশা করেন তিনি।

কলি রানীর কাছে এইচএসসির সাফল্য কেবল একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নয়; বরং আরও বড় স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা। নিজের অদম্য মনোবল ও পরিশ্রম দিয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার লক্ষ্যেই এগিয়ে যেতে চান তিনি।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

Link copied!