Kaler Alo
রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬
১৬ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

যশোর সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ১, ২০২৬, ১১:৫৫ এএম

আর্সেনিক দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে চৌগাছার মানুষ

যশোর সংবাদদাতা, কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ১, ২০২৬, ১১:৫৫ এএম

আর্সেনিক দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে চৌগাছার মানুষ

যশোরের চৌগাছা উপজেলায় পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। শুধু পানিই নয়, আর্সেনিকের প্রভাব পড়ছে এখানকার উৎপাদিত ধানেও। বিভিন্ন পরীক্ষায় ধানে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এতে উপজেলার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, পানিতে আর্সেনিকের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি লিটারে ০.০১ মিলিগ্রাম। বাংলাদেশে সরকারি মানদণ্ডে এই মাত্রা ০.০৫ মিলিগ্রাম। তবে চৌগাছা উপজেলায় পানিতে আর্সেনিকের গড় উপস্থিতি ২০ মিলিগ্রাম বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে এখানকার ধানেও আর্সেনিকের মাত্রা নির্ধারিত সহনশীল সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

ধানেও মিলছে সহনশীল মাত্রার বেশি আর্সেনিক
আন্তর্জাতিক সংস্থা কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশনের (সিএসি) নির্ধারিত মান অনুযায়ী, ধানে আর্সেনিকের সহনশীল মাত্রা ০.৩৫ পিপিএম। তবে চৌগাছার ধানে এর চেয়ে বেশি আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ধানে আর্সেনিকের উপস্থিতি ৫৬ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পানি ও খাদ্যশস্যে আর্সেনিকের এমন উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ধানের জমিতে সেচের পানি ব্যবহারের পদ্ধতি পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

আর্সেনিক কমাতে থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি
ধান ও চালে আর্সেনিকের উপস্থিতি সহনশীল পর্যায়ে রাখতে সেচ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে বেসরকারি সংস্থা এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক। জাপানের জাইকা ও জেএসটির কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় সংস্থাটি ‘নিরাপদ ও পুষ্টিকর ধান উৎপাদন’ বা সানরাইজ প্রকল্পের আওতায় এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এ কার্যক্রমে ব্যবহার করা হচ্ছে থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে তিন দিন জমিতে পানি ধরে রাখা হয় এবং পরবর্তী চার দিন জমি শুকিয়ে রাখা হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) উদ্ভাবিত এ পদ্ধতির মাধ্যমে জমিতে পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে ধানের চারার আর্সেনিক শোষণ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমিয়ে রাখার পরিবর্তে নির্দিষ্ট বিরতিতে পানি দেওয়া ও জমি শুকিয়ে রাখলে মাটিতে অক্সিডেটিভ পরিবেশ তৈরি হয়। এতে ধানের চারার আর্সেনিক শোষণ কমে এবং চালের অজৈব আর্সেনিকের মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে।

১২টি মডেল প্লটে চলছে কার্যক্রম
চৌগাছা উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিভিন্ন গ্রামে এ পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য ১২টি মডেল প্লট তৈরি করা হয়েছে। এগুলো হলো পৌরসভার হুদোপাড়া, চৌগাছা ইউনিয়নের কয়ারপাড়া, সিংহঝুলী ইউনিয়নের মাজালি, ফুলসারা ইউনিয়নের আড়ারদহ, জগদীশপুর ইউনিয়নের মাড়ুয়া, পাতিবিলা ইউনিয়নের সাদিপুর, হাকিমপুর ইউনিয়নের বকশিপুর, নারায়ণপুর ইউনিয়নের নারায়ণপুর, স্বরূপদাহ ইউনিয়নের স্বরূপদাহ, সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের মাকাপুর, ধুলিয়ানী ইউনিয়নের কুষ্টিয়া এবং পাশাপোল ইউনিয়নের রঘুনাথপুর।

এসব মডেল প্লটের কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন ১৪৪ জন কৃষক। পাশাপাশি আগামী ইরি-বোরো মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ৬০ জন সেচপাম্প মালিকের মাধ্যমে থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য কৃষক ও সেচপাম্প মালিকদের সচেতন করতে সভা, সেমিনার ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।

পানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি ফলন বাড়ার আশা
এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের উপজেলা সমন্বয়কারী আমিরুল ইসলাম বলেন, নিরাপদ ও পুষ্টিকর চালের ভাত খেতে হলে ধান উৎপাদনের সময় থেকেই আর্সেনিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এ জন্য তাঁরা দুটি পদ্ধতিতে কাজ করছেন। তবে মূল গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ধানের জমিতে পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে।

তিনি জানান, থ্রিএফফোরডি পদ্ধতিতে প্রচলিত সেচ ব্যবস্থার তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ পানি সাশ্রয় করা সম্ভব। পাশাপাশি ফলন ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে তাঁদের আশা। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরি-বোরো মৌসুমে সাধারণত সেচপাম্পের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে জমিতে ব্যবহার করা হয়। ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ কমে গেলে আর্সেনিকের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে ধানেও আর্সেনিকের উপস্থিতি বাড়তে পারে। এ কারণে সেচ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা জরুরি।

পদ্ধতি বদলে সুফল পাচ্ছেন কৃষক
আড়ারদহ গ্রামের কৃষক ইমদাদুল হক ও মাজালি গ্রামের হাফিজুর রহমান তপন জানান, ধানে আর্সেনিক থাকতে পারে—এ বিষয়ে আগে তাঁদের তেমন ধারণা ছিল না। আগে তাঁরা প্রচলিত নিয়মে ধানের জমিতে পানি দিতেন। তবে এখন থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। এতে তাঁরা ভালো ফল পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। কৃষকদের মধ্যে এ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, সেচ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এলে ধান ও চালে আর্সেনিকের মাত্রা কমিয়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে অগ্রগতি সম্ভব হবে।

পানির আর্সেনিক নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগ
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী ফেরদৌসী খাতুন বলেন, ধান বা চালে আর্সেনিক নিয়ন্ত্রণে সরকারি কোনো উদ্যোগ এখনো নেই। তবে পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা কমাতে সরকারি কার্যক্রম চলছে। তিনি জানান, উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ৯০টি অগভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এসব নলকূপের পানি সংগ্রহ করে আঞ্চলিক পানি পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে। যেসব নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে পানি পরিশোধনের জন্য ভ্যাসেল দেওয়া হচ্ছে। ফেরদৌসী খাতুন বলেন, চৌগাছা উপজেলায় আর্সেনিকের আধিক্য রয়েছে। আগের এক প্রতিবেদনে পানিতে গড়ে ২০ মিলিগ্রাম আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল।

উপজেলায় দেড় হাজার আর্সেনিক রোগী শনাক্তের তথ্য
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানুল মিজান রুমী বলেন, উপজেলায় আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য নেই। তবে আগের বিভিন্ন জরিপে প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোগীর তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। এখনো উপজেলা হাসপাতালে আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন এবং তাঁদের নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসার পাশাপাশি আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই এ রোগকে অবহেলা করা উচিত নয়।

সমস্যা দীর্ঘদিনের, সতর্ক থাকার পরামর্শ প্রশাসনের
চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ইসলাম বলেন, ধানে আর্সেনিকের উপস্থিতি নিয়ে একটি সংস্থা কাজ করছে বলে তিনি জেনেছেন। তবে এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে এখনো কোনো উদ্যোগ শুরু হয়নি। পানিতে আর্সেনিক নিয়ন্ত্রণে অগভীর নলকূপ স্থাপন এবং আর্সেনিক শনাক্ত হলে পানি পরিশোধনের জন্য ভ্যাসেল দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এ অঞ্চলে আর্সেনিক সমস্যা দীর্ঘদিনের। মানুষ যেসব নলকূপের পানি ব্যবহার করছে, তার অধিকাংশই এখন নিরাপদ নয়। তাই পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। চৌগাছায় পানির পাশাপাশি ধানেও আর্সেনিকের উপস্থিতির তথ্য নতুন করে জনস্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের বিষয়টি সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু পানির উৎস নিরাপদ করলেই হবে না, কৃষিজমিতে সেচের ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

Link copied!