Kaler Alo
রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬
১৬ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী
কালের আলো

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা,কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ১, ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

জলাবদ্ধতায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ বন্ধ

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা,কালের আলো

প্রকাশিত: নভেম্বর ১, ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

জলাবদ্ধতায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ বন্ধ

দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ। চলতি মৌসুমেও জেলার প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ করা সম্ভব হয়নি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ২৫ থেকে ৩০ হাজার কৃষক। দীর্ঘদিন জমিতে পানি জমে থাকায় অনাবাদি পড়ে থাকছে ফসলি জমি। ব্যাহত হচ্ছে খাদ্য উৎপাদন, সংকুচিত হচ্ছে কৃষকদের আয়ের সুযোগ। একই সঙ্গে হুমকির মুখে পড়ছে উপকূলীয় এলাকার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য।জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরার পাঁচ উপজেলায় মোট ১২ হাজার ৬৮৫ হেক্টর কৃষিজমি স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে রয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ৩ হাজার ৭৩০ হেক্টর, কলারোয়ায় ১ হাজার ৩৬০ হেক্টর, তালায় ৭ হাজার ৬৫ হেক্টর, আশাশুনিতে ৪৫০ হেক্টর এবং শ্যামনগরে ৮০ হেক্টর জমি রয়েছে।

জলাবদ্ধতায় বছরের পর বছর অনাবাদি জমি
সাতক্ষীরার অন্যতম বড় ফসলি বিল তালা উপজেলার শাকদাহ। বিলটির বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘদিন ধরে পানির নিচে থাকায় সেখানে আমন ধানের চাষ ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক সোহরাব হোসেন ও গোবিন্দ দাশ জানান, গত ৮ থেকে ১০ বছর ধরে জলাবদ্ধতার কারণে তাঁরা আমন ধান চাষ করতে পারছেন না। অথচ এক দশক আগেও তাঁদের জমিতে প্রচুর আমন ধান উৎপাদিত হতো। বর্তমানে শাকদাহ বিলের হাজার হাজার কৃষক আমন চাষ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বছরে শুধু বোরো ধান চাষ করা ছাড়া অন্য কোনো ফসল উৎপাদনের সুযোগ থাকছে না। জলাবদ্ধতার প্রভাব শুধু ফসল উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নেই। বিলের বিস্তীর্ণ চারণভূমি পানিতে ডুবে থাকায় গবাদিপশু পালনের সুযোগও কমে গেছে। ফলে এলাকায় গরু, ছাগল ও মহিষের সংখ্যা কমছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।

জলাবদ্ধতার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি নিষ্কাশনের সংকট
পরিবেশ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অতিবৃষ্টি, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সাতক্ষীরার জলাবদ্ধতা সংকটের অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে অপরিকল্পিত অবকাঠামো যুক্ত হয়ে উপকূলীয় এলাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে। ফলে জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ধীরে ধীরে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সময়মতো পানি না নামায় কৃষকেরা জমি প্রস্তুত করতে পারছেন না। আমন মৌসুমে চারা রোপণের উপযুক্ত সময় পার হয়ে যাওয়ায় অনেক জমিই অনাবাদি থেকে যাচ্ছে।

নদী-খাল পুনঃখননের দাবি
কৃষক আন্দোলন কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক অধ্যক্ষ আশেক-এলাহী বলেন, সাতক্ষীরার দুর্যোগ পরিস্থিতি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই। অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশু পালন, বসতবাড়ি ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে নদী ও খাল পুনঃখনন জরুরি বলে মনে করেন তিনি। আশেক-এলাহী বলেন, বিলের ভেতরে থাকা সরকারি খালগুলো সাধারণ কৃষকদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি এসব খাল দখল করে রাখায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিলে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

আমন আবাদে ব্যাহত হচ্ছে কৃষকের বিনিয়োগ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক ইকবাল আহমেদ বলেন, সাতক্ষীরার অর্থনীতি ও গ্রামীণ জনজীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। আমন ধান এ অঞ্চলের কৃষকদের গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি ফসল। কিন্তু জমিতে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় সময়মতো চারা রোপণ ও চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, এর ফলে কৃষকেরা শুধু একটি মৌসুমের উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন না, তাঁদের বীজ, সার, শ্রম ও জমি প্রস্তুতের পেছনে করা বিনিয়োগও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। তবে গত বছর কয়েকটি খাল পুনঃখননের ফলে চলতি মৌসুমে আমনের আবাদ প্রায় ৪৫০ হেক্টর বেড়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে আরও বেশি জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

বিকল্প ফসল ও কৃষি পুনর্বাসনের পরামর্শ
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাতক্ষীরা কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শিমুল মণ্ডল বলেন, জলাবদ্ধতার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে এলাকাভিত্তিক পানিপ্রবাহ ও নিষ্কাশনব্যবস্থা নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা প্রয়োজন। পাশাপাশি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় উপযোগী ফসলের জাত নির্বাচন, বিকল্প চাষাবাদ পদ্ধতি চালু, কৃষি পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা জোরদার করতে হবে। তিনি আরও বলেন, শুধু কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেই হবে না। জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং গবাদিপশু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সাতক্ষীরার কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নদী-খাল পুনঃখনন, পানি নিষ্কাশনের বাধা দূর করা এবং কৃষকদের পুনর্বাসনে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে জেলার বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি অনাবাদি থাকার ঝুঁকি আরও বাড়বে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

Link copied!